নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো প্রবাদটি আমাদের সমাজে প্রায়ই নেতি বাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন কেউ নিজের সামান্য আয় থেকে বাঁচিয়ে সমাজের সবচেয়ে অসহায়, ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, তখন সেই কাজ প্রবাদকে ছাড়িয়ে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। ঠিক এমন এক অনন্য নজির গড়েছেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলা পরিষদের ড্রাইভার আমিনুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক গনেশ হেমরম।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এখন তাদের এই মানবিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছে। সামান্য আয়ে অসামান্য ত্যাগ আমিনুল ইসলাম পেশায় একজন সরকারি গাড়িচালক এবং গনেশ হেমরম অফিস সহায়ক। সরকারি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হিসেবে তাদের মাসিক বেতন খুবই সীমিত। বর্তমান নিত্য পণ্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে এই আয়ে নিজেদের সংসার চালানোই যেখানে দুরূহ, সেখানে তারা বেছে নিয়েছেন এক ভিন্ন পথ। নিজেরা কষ্ট করেও তারা ভুলে যাননি সমাজের অতি দরিদ্র, বৃদ্ধ, গরিব, অসহায় ও অসচ্ছল মানুষদের কথা।
শুধু খোঁজ-খবর নয়, এক বেলার আহার দীর্ঘ দিন ধরেই এই দুই মানবিক ব্যক্তি বিরল উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসহায় মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কিন্তু তারা শুধু মৌখিক সান্ত্বনা বা খোঁজ খবর নেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। আমিনুল ও গনেশ তাদের উপার্জনের একটি অংশ জমিয়ে নিয়মিত এসব ছিন্নমূল ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য অন্তত এক বেলার পুষ্টি কর খাবারের ব্যবস্থা করে আসছেন।
তাদের এই উদ্যোগের মূল বৈশিষ্ট্য গুলো হলো ব্যক্তিগত তহবিল, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছাড়াই নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে এই কার্যক্রম চালান। তাছাড়া সরাসরি সংযোগ সৃষ্টি করে নিজেরাই অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের কাছে গিয়ে খাবার পৌঁছে দেন।
এটি কোনো সাময়িক লোক দেখানো কাজ নয়, বরং দীর্ঘর্ দিন ধরে তারা নিরলস ভাবে এই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ফেসবুকে প্রশংসার জোয়ার সম্প্রতি তাদের এই মানবিক কাজের কিছু ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনরা আমিনুল ও গনেশের এই উদ্যোগকে সাধু-বাদ জানিয়েছেন। অনেকে মন্তব্য করেছেন, সমাজের বিত্তবানরা যেখানে মুখ ফিরিয়ে রাখছেন, সেখানে এই দুজন সাধারণ চাকুরিজীবী আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন।
মানবতার জয়গান মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য।। ভূপেন হাজারিকার এই চিরন্তন বাণীটিকে আক্ষরিক অর্থেই বাস্তবে রূপ দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম ও গনেশ হেমরম। তাদের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মানবিকতা প্রমাণ করে যে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্সের প্রয়োজন হয় না, শুধু একটা বড় হৃদয়ের প্রয়োজন হয়। বিরলের এই দুই বীর সমাজের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন