ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার দুই বাসিন্দা। তাদের একজন উপজেলার তারালী ইউনিয়নের বরেয়া গ্রামের আলিমুজ্জামান সাজু (৪৫)। তিনি পেশায় ঘের ব্যবসায়ী। অপরজন তেঁতুলিয়া গ্রামের ভবেশ সরকারের স্ত্রী রেবতী সরকার।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে সাজুর মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছালে বরেয়া গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের চোখে-মুখে তখন শুধু বিষাদের ছাপ।
সাজুর বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল হোসেন দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে ছিলেন। সাজু ভারতে যাওয়ার আগে বাড়ির দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে গিয়েছিলেন।
ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ওই বাড়িটা আমি দেখাশোনা করতাম। ইট নিয়ে আসা হয়েছে। দুই-এক দিনের মধ্যে আমরা কাজ শুরু করব এমন কথা ছিল। উনি বলেছিলেন, আমি ইন্ডিয়া থেকে আসি, ঘের-বেড়ি ওইদিকে তুই দেখিস, আমি এসে কাজে হাত দেব। কিন্তু এর মধ্যেই দুর্ঘটনা হয়ে গেল। এখন আর কী করতে পারি, কী বলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
কথা বলতে বলতে থেমে যান ইসমাইল। যে বাড়িতে সাজুর ফিরে এসে দ্বিতীয় তলার কাজে হাত দেওয়ার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন তার ফেরার অপেক্ষা নেই।
সাজুর বড় ভাই সাহেব আলী সরদার বলেন, ‘অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা নিতে ভারতে গিয়েছিলেন তার ভাই। কলকাতার একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন তিনি।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য কলকাতা গিয়েছিল। হোটেলে ছিল। হঠাৎ জানতে পারি, সেখানে আগুন লেগেছে। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হই, আমার ভাই মারা গেছে। এরপর বাংলাদেশ সরকারের হটলাইনে যোগাযোগ করেছি। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমার ভাইয়ের লাশটা যেন দ্রুত দেশে এনে দেওয়া হয়। সাজুর বুধবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই ফেরাটা আর হলো না।’
অগ্নিকাণ্ডে নিহত অপর বাংলাদেশি রেবতী সরকারও কালিগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ভবেশ সরকারের স্ত্রী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন রেবতী। কলকাতার ওই হোটেলে অবস্থানকালে অগ্নিকাণ্ডে তার মৃত্যু হয়। তার বাড়িতে গিয়ে সেটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয়রা জানান, রেবতীর স্বামী ভবেশ সরকার মঙ্গলবার ঢাকায় ভিসা সেন্টারের কাজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন।
সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাওসার আজিজ বলেন, ‘কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে একজনের মৃত্যুর বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। তার লাশ দেশে আনার বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন কাজ করছে।’
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরাও খোঁজখবর রাখছি। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে আমরা সহযোগিতা করব। অপর নিহত নারীর লাশ দেশে আনার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।’
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত দুইটার দিকে কলকাতার ওই হোটেলে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। প্রথমে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরে আরও দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে। সব মিলিয়ে নয়জনের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। হোটেলটিতে প্রায় ২৫ জন বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে।
কলকাতার সেই আগুন শুধু একটি হোটেল পুড়িয়েছে, এমন নয়। সাতক্ষীরার দুটি পরিবারেও রেখে গেছে অনন্ত শূন্যতা।
বরেয়া গ্রামের বাড়িতে দ্বিতীয় তলার জন্য আনা ইটগুলো হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই দেয়ালে বসত। নতুন একটি ঘর তৈরি হতো। কিন্তু সেই ঘরে আর থাকা হবে না সাজুর।
বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইলের কাছে ইটগুলো এখন শুধু নির্মাণসামগ্রী নয়, সাজুর অসমাপ্ত স্বপ্নের স্মৃতি। আর পরিবারের কাছে সাজুর ফেরার পথ এখন একটাই, শেষবারের মতো তার মরদেহ ফিরে আসা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন