কুড়িগ্রাম শহরের প্রান্ত ছুঁয়ে, নিভৃত ছড়ার পাড়ে হাল মাঝিপাড়ার ছোট্ট একটি কুঠরি। মায়ের তরীর সাহসালয় গুরুগৃহ। শুক্রবার আর শনিবার বিকেল হলেই সেই ঘরটিতে জড়ো হয় একদল প্রান্তিক শিশু। তাদের কারও বাবার জীবিকা জলের সঙ্গে বাঁধা— উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ ধরেন, বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন, সেই সামান্য আয়েই চলে সংসারের চাকা।
বিকেল ঠিক তিনটায় হারমনিয়াম নিয়ে বসেন গানের গুরু রফিকুল। পাশে তাল সঙ্গত করেন আরেক গুরু পূর্ণ। খলিলগঞ্জ বাজারে মানুষের কেনা মাছ কেটে দেওয়ার সামান্য মজুরিই তাঁর জীবনের অবলম্বন। দুজন মানুষের জীবনের ক্লান্তি তখন যেন মিলিয়ে যায় শিশুদের কোমল কণ্ঠের কাছে।
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ কিংবা "হাছন রাজায় কয়, আমি কিছু নয় রে, আমি কিছু নয়"... লালন, হাছন, শাহ আব্দুল করিমসহ বিভিন্ন মহাজনের গান যখন উচ্চারিত হয় ছোট ছোট কণ্ঠে, তখন আশপাশের মাছের আঁশটে গন্ধকেও যেন হার মানায় সুরের মূর্ছনা। কুঠরির টিনের চাল পেরিয়ে সেই গান ছড়িয়ে পড়ে ছড়ার জলে, কাশবনে, ভেজা বাতাসে—দারিদ্র্যের উঠোনে ফুটে ওঠে এক টুকরো স্বপ্ন।
আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পানিতে ভেজা, রোদে পোড়া, তামাটে চামড়ার বাবারা কিছুক্ষণ চুপ করে শোনেন। তাঁদের চোখে হয়তো হিসাব থাকে—আজ কত মাছ উঠল, কত টাকায় বিক্রি হবে, রাতে হাঁড়িতে কী উঠবে। কিন্তু সন্তানের কণ্ঠে গান উঠলে সেই হিসাবও কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায়।
তাঁরা তখন অভাবের কথা ভুলে যান।
মাছের গন্ধ ছাপিয়ে, জীবনের দুঃখ ছাপিয়ে, ছোট্ট কুঠরিঘরটিতে তখন শুধু গানই থাকে—আর থাকে স্বপ্ন।
যে স্বপ্ন হয়তো একদিন এই প্রান্তিক শিশুদের জীবনকে অন্য এক তীরে নিয়ে যাবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন