কালো ব্যাজ ধারণ, শহিদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি, শোক র্যালি ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে পালিত হয়েছে ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকাল থেকে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
সকালে ফুলবাড়ী পৌরসভার সাবেক মেয়র মর্তুজা সরকার মানিকের নেতৃত্বে স্থানীয় বাসিন্দারা একটি শোক র্যালি বের করেন এবং শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। সেখানে ফুলবাড়ী রক্ষার শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়। পরবর্তীতে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধাঞ্জলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
কর্মসূচি শেষে ফুলবাড়ীর নিমতলা মোড় এলাকায় এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘দায়িত্বহীন ও বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, ‘২০০৬ সালে আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের ন্যায্যতা মেনে ৬ দফা চুক্তি করেছিল, যার ঐতিহাসিক মূল্য অসীম। কিন্তু বর্তমানে সেই চুক্তি ভঙ্গ করে উত্তরবঙ্গের পানিসম্পদ, কৃষি জমি ও ঘনবসতি ধ্বংস করে পুনরায় কয়লা উত্তোলনের পাঁচতারা চলছে। কোম্পানি ও তার সহযোগীদের মুনাফার স্বার্থে দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া মানুষ মেনে নেবে না।’
তিনি অবিলম্বে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার এবং ঐতিহাসিক ৬ দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানান। চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে চলতি বছরের মধ্যেই কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহবায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (বর্তমানে প্রয়াত) ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সেদিন লক্ষাধিক মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেন। ঢাকা মোড় থেকে মিছিল নিয়ে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও করতে যাওয়ার সময় ছোট যমুনা নদীর পূর্ব প্রান্তে পুলিশ ও বিডিআরের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। পরে সংগঠনের সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ নিমতলা মোড়ে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে ঘেরাও কর্মসূচি সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এরই এক পর্যায়ে পুলিশ ও বিডিআর আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং বিডিআর গুলি চালায়। এতে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামের তিন তরুণ নিহত এবং দুই শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। এরপর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ফুলবাড়ীসহ পুরো খনি এলাকা। ৩০ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনের নেতারা। আলোচনায় আন্দোলনকারীদের ৬ দফা প্রস্তাব মেনে নেওয়া হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি বাস্তবায়ন করা যাবে না।
ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক সাবেক পৌর মেয়র মুরতুজা সরকার মানিক বলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত ছয় দফা চুক্তিতে ছিল আন্দোলকারীদের নামে কোনো মামলা করা যাবে না। কিন্তু এশিয়া এনার্জি একাধিক মামলা দিয়ে আন্দোলকারী নেতাকর্মীদের হয়রানী করছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে পূর্বের চেয়েও আরো কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল ও সদস্য সচিব জয় প্রকাশ গুপ্ত বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন না হলে এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করতে ফুলবাড়ীবাসী আবার ঐক্যবদ্ধ হবে। তিন ফসলি জমি আমাদের স্থায়ী সম্পদ। অস্থায়ী সম্পদের জন্য এটি নষ্ট করা যাবে না।’
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন