চল্লিশ বছর আগে পায়ে লোহার তারকাটা ফুটেছিল। সাধারণ ক্ষত ভেবে প্রথমে গুরুত্ব দেননি। পরে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের চেষ্টার পর ধরা পড়ে ক্যান্সার। জীবন বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয় দুই পা। এরপর বন্ধ হয়ে যায় উপার্জনের পথ। তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্য কোনো কিছুই দমাতে পারেনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সেকেন্দার আলীকে। হুইলচেয়ারে ভর করে ছোট একটি পান-সিগারেটের দোকান চালিয়ে একে একে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বৃদ্ধ বয়সেও সেই দোকানই তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বন।
সেকেন্দার আলী(৬০) রাজারহাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের মেকুরটারী শান্তিনগর গ্রামের মৃত ঈমান তেলীর ছেলে। শুক্রবার(২৮আগষ্ট) সকালে তিনি জানান, যুবক বয়সে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। বড় ভাই আকবর আলীর কাঠের ফার্মেও কাজ করেছেন। প্রায় ৪০ বছর আগে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত তাঁর পায়ে লোহার তারকাটা ফুটে যায়। ক্ষতটি ধীরে ধীরে জটিল আকার ধারণ করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ক্যান্সার ধরা পড়লে জীবন রক্ষায় চিকিৎসকরা তাঁর দুটি পা কেটে ফেলেন। দুই পা হারানোর পর কর্মক্ষমতা হারিয়ে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন সেকেন্দার। বড় ভাইয়ের পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লেও পরে তাঁকে বিয়ে দিয়ে আলাদা সংসার করে দেওয়া হয়। দাম্পত্য জীবনে তাঁর এক ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম।
ভিক্ষাবৃত্তিকে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেননি তিনি। নিজের জমানো সামান্য টাকা ও স্থানীয় শান্তিনগর মসজিদ থেকে পাওয়া কিছু অনুদান দিয়ে শুরু করেন শান্তিনগর এলাকায় পান-সিগারেটের ছোট দোকান। হুইলচেয়ারে বসে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দোকানে সময় দেন। ক্রেতাদের পান-সিগারেট বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার।
সেকেন্দারের সংগ্রাম ও সততার বিষয়টি একসময় নজরে আসে স্থানীয় প্রশাসনের। ২০১৫ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম তাঁর দোকানে যান। বর্তমানে তিনি দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত। সেকেন্দার ও তাঁর দোকানের ক্রেতাদের বসার সুবিধার জন্য দোকানের সামনে টাইলস দিয়ে পাকা বসার ব্যবস্থা করে দেন তিনি। পরে ‘শিকড়থ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাঁর চলাচলের সুবিধার্থে একটি হুইলচেয়ার উপহার দেয়। প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও নিয়মিত দোকানে আসেন সেকেন্দার। পাশাপাশি হুইলচেয়ারে করে স্থানীয় মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। সামান্য আয়ের মধ্যেই সন্তানদের পড়াশোনা, সংসার পরিচালনা এবং মেয়েদের বিয়ের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তাঁকে।
অভাবের সংসারে তিন মেয়েকে বড় করে তাদের বিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। পান দোকানের আয় থেকে সাধ্যমতো সঞ্চয় করে একে একে তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের বিয়ের খরচ জোগাতে গিয়ে নিজে নানা কষ্ট সহ্য করলেও কারও কাছে হাত পাতেননি বলে জানান স্থানীয়রা। বর্তমানে তাঁর তিন মেয়েই শ্বশুরবাড়িতে সংসার করছেন। আর বৃদ্ধ সেকেন্দার এখনও প্রতিদিন হুইলচেয়ারে ভর করে দোকানে আসেন। দোকানটি তাঁর কাছে শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি তাঁর আত্মমর্যাদা ও স্বনির্ভরতার প্রতীক।
স্থানীয় বাসিন্দা ইমতিয়াজুল ইসলাম, বাবুসহ অনেকে বলেন, দুই পা হারানোর পরও সেকেন্দার আলী ভিক্ষাবৃত্তিতে না গিয়ে নিজের শ্রম ও সততার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছেন। তাঁর জীবনসংগ্রাম অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার। শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও মানসিকভাবে তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এসএম হাবিবুর রহমান বলেন, বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাকে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এ ব্যাপারে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানজিলা তাসনিম বলেন, বিষয়টি আমি আপনার কাছে শুনলাম। একসময় দোকানটি দেখতে যাবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন