"আপনি ভাতা নেন, একলা এভাবে কতদিন চলবেন.. রমা মা বললেন, ছেলে দিয়েছি, স্বামী দিয়েছি, সম্ভ্রম দিয়েছি। তার তো ক্ষতিপূরণ হবে না। ভাতা নিয়ে কি করব!"
'রমা চৌধুরী' বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত একজন বীরাঙ্গনা। ১৯৭১ সালের ১৩ মে ভোরের দিকে যিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিজ বাড়িতে নির্যাতনের শিকার হন। সম্ভ্রম হারানোর পর পাকিস্তানি দোসরদের হাত থেকে পালিয়ে পুকুরে নেমে আত্মরক্ষা করেছিলেন তিনি। তারপর হানাদাররা গান-পাউডার লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘর-বাড়িসহ যাবতীয় সহায়-সম্পদ।
সম্ভ্রম, নিজের ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব হারিয়ে আত্মহননের পথই বেছে নিচ্ছিলেন প্রায়। সন্তানদের মুখ মনে পড়ায় সে পথ থেকে ফিরে আসেন৷ যুদ্ধের বাকি সময়টা বৃদ্ধা মা ও সন্তানদের নিয়ে জঙ্গলে, বনে-বাদাড়ে লুকিয়ে কাটান। রাত হলে আগুনে পোড়া ভিটেতে ফিরে এসে পলিথিনের নীচে কোনো রকমে রাত কাটাতেন।
তবুও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি এই বীরাঙ্গনা। শুরু করেন নতুন ভাবে পথচলা। লিখে ফেলেন ‘একাত্তরের জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’ এবং ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’ সহ ১৮টি বই। এসব বই বিক্রি করেই চলতো তাঁর সংসার। স্বাধীনতার পরে লেখালেখি ছিল তাঁর পেশা। প্রথমে তিনি একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০ টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলতো তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজের লেখা বই প্রকাশ করে নিজেই বই ফেরি করতে শুরু করেন।
তাঁর ছেলেরা এই দেশের মাটিতে শুয়ে আছে দেখে পায়ে জুতা পড়েননি আর কখনো। খালি পায়েই হেঁটে চলেছেন মাইলের পর মেইল, বছরের পর বছর।
অর্থাভাবে অনেক কষ্টে দিন কাটাতেন কিন্তু তবুও কারো কাছ থেকে সাহায্য নেননি এই মহীয়সী নারী। এবং একই সঙ্গে তিনি পরিচালনা করছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রম। প্রচণ্ড কষ্টের জীবন কাটলেও তাঁর দু’চোখে স্বপ্ন ছিলো সুখ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চেয়েছিলেন রমা চৌধুরী। অনাথ'রা সেখানে থাকবে। মনুষ্য দীক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তারা কর্মজীবনে প্রবেশ করবে।
আজ তাঁর চলে যাবার দিন। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।
মা, আপনিই আমাদের লাল সবুজের বাংলাদেশ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন