ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত জয়পুরহাটের পাঁচবিবি রেলস্টেশনটি দীর্ঘদিন ধরে পাঁচবিবি,হিলি, ঘোড়াঘাটসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ এ স্টেশন থেকে ট্রেনে যাতায়াত করে থাকেন। রেলওয়ের আয়ও হচ্ছে নিয়মিত। তবে সময়ের সঙ্গে যাত্রীসংখ্যা ও রাজস্ব আয় বাড়লেও সে তুলনায় বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও মৌলিক সুবিধার ঘাটতিতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।
সম্প্রতি সরেজমিনে পাঁচবিবি রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত অপেক্ষাকক্ষ ও বসার ব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত পায়খানা-প্রস্রাবখানা ও গোসলের সুবিধা। ফলে ট্রেনের অপেক্ষায় নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে গরমের সময় ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
স্টেশনে বর্তমানে একটি কক্ষেই টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আলাদা ও পর্যাপ্ত অপেক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীদের স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে বসে কিংবা দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
একসময় যাত্রীদের স্বস্তির জন্য স্টেশনটিতে ১২টি ফ্যান ছিল। বর্তমানে দৃশ্যমান ও সচল রয়েছে মাত্র দুটি। স্টেশনসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বাকি ১০টি ফ্যান মেরামতের জন্য খুলে রাখা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও সেগুলো পুনঃস্থাপন করা হয়নি।
স্টেশনে যাত্রীদের অপেক্ষার জন্য থাকা ওয়েটিং রুমও নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে জানা গেছে। ফলে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মেই সময় কাটাতে হচ্ছে।
স্টেশন মাস্টারের আবাসিক কোয়ার্টারের কয়েকটি কক্ষের ব্যবহার নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় একটি সূত্রের অভিযোগ, বিগত সময়ে কোয়ার্টারের জায়গাগুলো অর্থের বিনিময়ে অন্যদের ব্যবহার বা দখলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় তৎকালীন পাকশী বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কানুনগো মেহেদীর যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি কোয়ার্টারের স্থানগুলো কার অনুমোদনে ব্যবহার করা হচ্ছে, এ বিষয়ে কোনো সরকারি বরাদ্দ বা অনুমোদন রয়েছে কি না এবং এর সঙ্গে রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্টেশনে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার অভিযোগ রয়েছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশও নোংরা হচ্ছে।
স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ একটি রেলস্টেশনে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু পাঁচবিবি স্টেশনে এ ব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত না হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি স্টেশনের পরিবেশ ও সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় যাত্রী ও সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন, যে স্টেশন থেকে নিয়মিত টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন খাতে রেলওয়ের আয় হচ্ছে, সেখানে যাত্রীসেবার মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হচ্ছে না কেন?
তাদের মতে, শুধু ট্রেন চলাচল করলেই একটি রেলস্টেশনের দায়িত্ব শেষ হয় না। যাত্রীদের জন্য নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, শৌচাগার, অপেক্ষাকক্ষ, বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় তথ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাঁচবিবিবাসীর দীর্ঘদিনের আরেকটি দাবি—খুলনাগামী আন্তঃনগর রূপসা এক্সপ্রেস ও সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনের পাঁচবিবি রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি দেওয়া।
স্থানীয়দের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এ দুটি আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি চালু হলে পাঁচবিবি ও আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াত আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে রেলওয়ের যাত্রীসংখ্যা ও রাজস্ব আয়।
পাঁচবিবি রেলস্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় যাত্রীরা।
তাদের দাবি, স্টেশনের অবকাঠামোগত সমস্যা, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ার কারণ, মেরামতের জন্য খুলে নেওয়া ১০টি ফ্যানের বর্তমান অবস্থা, স্টেশন মাস্টারের কোয়ার্টারের জায়গাগুলো ব্যবহারের বৈধতা এবং পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বে থাকা জনবলের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় যাত্রীদের প্রত্যাশা, দ্রুত পাঁচবিবি রেলস্টেশনে পর্যাপ্ত অপেক্ষাকক্ষ ও বসার ব্যবস্থা, পায়খানা-প্রস্রাবখানা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ফ্যান, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
শুধু রাজস্ব আদায় নয়, যাত্রীসেবাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে পাঁচবিবি রেলস্টেশনকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও যাত্রীবান্ধব স্টেশনে রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি রূপসা ও সীমান্ত এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতির দাবিটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল, রাজশাহীর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বলেন, স্টেশনের ছাউনি দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। এতে ফ্যানগুলো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সেগুলো খুলে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে স্টেশনের ছাউনি সংস্কারের জন্য টেন্ডার হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে। আমাদের জনবল সংকটের কারণে ওয়েটিং রুমটি খোলা হয় না।” তবে দ্রুত পায়খানা-প্রস্রাবখানার ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান।
স্টেশন মাস্টারের কোয়ার্টারগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের জিএম তিনি সংশ্লিষ্ট ডিইওর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন