বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য ভেনিস থেকে এলো একসঙ্গে দুটি বড় সুখবর। তরুণ নির্মাতা রাকায়েত রাব্বির স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য সুইটনেস অব এয়ার, হাওয়াই মিঠাই’ জিতেছে সেরা পরিচালকের পুরস্কার। এর একদিন পরই রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ পেয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসের ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ সম্মাননা। ভেনিসের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরপর দুই অর্জন বাংলাদেশের সিনেমাকে নতুনভাবে আলোচনায় এনেছে।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে ঘিরে আয়োজিত স্বাধীন চলচ্চিত্র উৎসব ‘সন অব আ পিচ অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ রাকায়েত রাব্বির সেরা পরিচালক হওয়ার খবর আসে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর)। ভেনিসের ঐতিহাসিক হোটেল এক্সেলসিয়রের ক্যাম্পারি লাউঞ্জে আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়।
‘দ্য সুইটনেস অব এয়ার, হাওয়াই মিঠাই’ চলচ্চিত্রে যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতার মধ্যে একটি শিশুর মনোজগৎকে গল্পের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বুলেটের খোসার বিনিময়ে হাওয়াই মিঠাই কেনার একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের অমানবিকতা, শিশুর সরলতা, আকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপদ শৈশবের স্বপ্ন তুলে ধরা হয়েছে।
সাধারণ একটি মিষ্টির প্রতি শিশুর আকর্ষণের সঙ্গে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞকে যুক্ত করে নির্মাতা তৈরি করেছেন মানবিক আবহের গল্প। সংশ্লিষ্টদের মতে, চলচ্চিত্রটির এই ভিন্নধর্মী উপস্থাপনাই আন্তর্জাতিক বিচারকদের নজর কেড়েছে।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাকায়েত রাব্বি বলেন, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের এমন মর্যাদাপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে পুরস্কার অর্জন তার জন্য অত্যন্ত আবেগের ও গর্বের মুহূর্ত। চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর সময় এবং পুরস্কার ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক প্রযোজক ও পরিবেশকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
রাকায়েতের চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে যুদ্ধবিরোধী বার্তা। তিনি এমন একটি পৃথিবীর কথা বলতে চেয়েছেন, যেখানে কোনো যুদ্ধ থাকবে না এবং কোনো শিশুকে যুদ্ধের কারণে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে না। প্রতিটি শিশু যেন পরিবারের নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে এবং সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারে, সেটিই ছিল চলচ্চিত্রটির অন্যতম মূল বক্তব্য।
পুরস্কার অর্জনের জন্য চলচ্চিত্রটির পুরো টিমের পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করে রাকায়েত রাব্বি ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টর এমানুয়েলা জেনোভেসের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান।
অভিনেতা মিজানুর রহমানও এই অর্জনকে বাংলাদেশের জন্য গর্বের বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, ভেনিসের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রাঙ্গনে বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরিচিত ব্যক্তিদের সামনে চলচ্চিত্রটির নামের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হওয়া পুরো দলের জন্য বিশেষ মুহূর্ত। তার ভাষ্য, এই স্বীকৃতি শুধু একটি চলচ্চিত্রের অর্জন নয়, বাংলাদেশের স্বাধীন ও বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্যও অনুপ্রেরণার ঘটনা।
রাকায়েত রাব্বির আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে ভেনিসের কা’ ফস্কারি শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও অংশ নিয়ে প্রশংসা পেয়েছিলেন তিনি। দুই বছর পর আবারও ভেনিসে তার নির্মাণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্যও এসেছে ঐতিহাসিক সাফল্য। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ পেয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসের ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ পুরস্কার। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সময় রাত প্রায় ১১টার দিকে ভেনিসে নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেনের হাতে এই সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ প্রথমবারের মতো ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অফিসিয়াল শাখায় নির্বাচিত কোনো বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। অরিজন্তি বিভাগে জায়গা করে নেওয়ার পর এবার পুরস্কারও জিতে নিল সিনেমাটি। ফলে ভেনিসের অফিসিয়াল শাখায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অভিষেকই হয়ে উঠল পুরস্কারময়।
পুরস্কার গ্রহণের পর রুবাইয়াত হোসেন বলেন, ভেনিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে বিশ্বের অসংখ্য চলচ্চিত্রের মধ্য থেকে তার সিনেমাকে বেছে নেওয়া অত্যন্ত সম্মানের। এই স্বীকৃতি শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নারীর শরীর, আত্মপরিচয় এবং নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। নির্মাতার ভাবনায় নারীরা কীভাবে নিজেদের শরীরকে ধারণ করতে শেখে এবং কখনও সেই শরীরকেই ভয় করতে শেখে, সেই অভিজ্ঞতাই সিনেমাটির গল্পের অন্যতম ভিত্তি।
সিনেমাটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনিন করিম চৌধুরী। অতিথি চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন ও সুনেরাহ্ বিনতে কামাল। এছাড়া অভিনয় করেছেন শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম, মোহাম্মদ বারী ও রিকিতা নন্দিনী শিমুসহ আরও অনেকে।
ভেনিসে সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ৬ সেপ্টেম্বর। ভেনিসের পাশাপাশি টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হচ্ছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’।
ভেনিসে অংশ নিতে গিয়ে সিনেমাটির অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হামলার শিকার হওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। সেই ঘটনার পর একই সিনেমার আন্তর্জাতিক পুরস্কার জয় বাংলাদেশি চলচ্চিত্র অঙ্গনে বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ হয়ে এসেছে।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসর ২ সেপ্টেম্বর ভেনিসের লিডোতে শুরু হয়েছে। উৎসব শেষ হচ্ছে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। এদিন অফিসিয়াল শাখার মূল পুরস্কার ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। সেই মূল প্রতিযোগিতার আগেই বাংলাদেশের দুটি চলচ্চিত্রের এমন সাফল্য দেশের নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকর্মীদের জন্য নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে।
একদিকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রাকায়েত রাব্বির সেরা পরিচালক পুরস্কার, অন্যদিকে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। দুটি অর্জনই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক উৎসবের আলোচনায় আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। একই সঙ্গে ‘দ্য সুইটনেস অব এয়ার, হাওয়াই মিঠাই’ ঘিরে ইতালি ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে সম্ভাব্য কো-প্রোডাকশন ও বিতরণ নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ফলে ভেনিসের এই সাফল্য শুধু পুরস্কারে থেমে না থেকে বাংলাদেশের স্বাধীন ও বিকল্পধারার সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন