দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন সড়কে অবৈধ তিন চাকার যানবাহনের দাপট বেড়েছে। পাওয়ার টিলার ট্রলি, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ভটভটি, নছিমন, করিমন, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইকসহ অনুমোদনহীন বিভিন্ন যানবাহন অবাধে চলাচল করায় ঝুঁকিতে পড়েছেন দূরপাল্লার বাস-ট্রাকের চালক, মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারীরা। এতে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঘোড়াঘাট-গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কসহ উপজেলার বিভিন্ন প্রধান ও আঞ্চলিক সড়কে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি, ভটভটি, নছিমন-করিমনসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার যান। এসব যানবাহনের অনেকগুলোরই নিবন্ধন, রুট পারমিট, বীমা ও প্রশিক্ষিত চালক নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে এসব যানবাহনের অনুমোদন না থাকলেও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। বিশেষ করে ইটভাটা, বালু ও মাটি পরিবহনে ট্রলি ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ব্যবহার বেশি। উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটায় মাটি ও ইট পরিবহনে একাধিক ট্রলি ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে মহাসড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ সড়কেও এসব যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
চালকদের অভিযোগ, এসব গাড়িতে অনেক সময় শক্তিশালী ব্রেক, পর্যাপ্ত লাইট বা লুকিং গ্লাস থাকে না। কোনো কোনো যানবাহনে উচ্চ শব্দের হাইড্রোলিক হর্নও ব্যবহার করা হয়। ফলে পেছন থেকে হর্ন দিলেও সামনে থাকা চালক অনেক সময় বুঝতে পারেন না। আবার যেখানে-সেখানে থেমে যাওয়া, হঠাৎ ইউটার্ন নেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করার কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
মহাসড়কের পরিবহন চালক হাবিবুল বাশার ইসলাম বলেন, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত এসব ছোট যান মহাসড়কে চলাচল করায় দূরপাল্লার যানবাহন চালাতে গিয়ে ঝুঁকি নিতে হয়। অনেক গাড়িতে লুকিং গ্লাস থাকে না, ব্রেকও পর্যাপ্ত নয়। আবার হঠাৎ করে সড়কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায় কিংবা ইউটার্ন নেয়। এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় পথচারী ও মোটরসাইকেল চালকরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য, পেছন থেকে হর্ন দেওয়ার পরও অনেক সময় এসব যানবাহন সাইড দেয় না। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা পেলেই তারা দ্রুতগতিতে চলাচল করে এবং একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দেয়। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আতঙ্কে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, ঘোড়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় ইটভাটা ও মাটি-বালু পরিবহনের কাজে বিপুলসংখ্যক ট্রলি ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান ব্যবহৃত হচ্ছে। করতোয়া নদীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন এবং ইটভাটায় মাটি সরবরাহের কাজেও এসব যান ব্যবহার করা হয়। শীত মৌসুমে ইটভাটাগুলো চালু হলে এসব যানবাহনের চলাচল আরও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত ভ্যান, ইজিবাইক ও বিভিন্ন ধরনের ছোট যানবাহনও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চলাচল করছে। এসব যানবাহনের কারণে অনেক সময় যানজট ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ পথচারীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ট্রলি ও ভটভটি চালক বলেন, এসব যান চালিয়েই তাদের সংসার চলে। নতুন ইজিবাইক বা অন্য যানবাহন কেনার সামর্থ্য তাদের নেই। তাই জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি জেনেও এসব গাড়ি চালাতে হচ্ছে।
তবে কয়েকজন চালক দাবি করেন, স্থানীয় মালিক বা সমিতির মাধ্যমে মাসিক চুক্তিতে টাকা দিয়ে সড়কে চলাচল করতে হয়। পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে ম্যানেজ করেই অনেক সময় গাড়ি চালানো হয় বলেও তারা অভিযোগ করেন। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, মাঝে মধ্যে এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা নিয়মিত নয়। অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর আবারও আগের মতোই মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল শুরু হয়। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এদিকে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত নির্দেশনামূলক সাইন, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা ও পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে অবৈধ যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল, কালো ধোঁয়া ও অতিরিক্ত শব্দে পরিবেশ ও জনজীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানান।
দুর্ঘটনা কমাতে মহাসড়কে অবৈধ ও অনুমোদনহীন যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ট্রলি ও ভটভটির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বৈধ যানবাহনের চালক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের দাবি, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালনা করে নয়, মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এসব যানবাহনের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন