দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) ও বিরামপুরে মাঠজুড়ে এখন পাট কাটার ধুম। ভোরের আলো ফুটতেই কাঁচি হাতে কৃষকেরা ছুটছেন পাটক্ষেতে। কেউ কাটছেন পাট, কেউ আঁটি বাঁধছেন, আবার কেউ কাটা পাট নিয়ে ছুটছেন জলাশয়ের দিকে। সেখানে জাগ দেওয়ার পর চলছে আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজ।
মাঠের ব্যস্ততা শেষ করে কৃষকেরা শুকনো পাট নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় হাটে। ফলে মাঠ থেকে হাট—সবখানেই এখন ব্যস্ততা ‘সোনালি আঁশ’ পাটকে ঘিরে।
চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের ফলন বেশ ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা। প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে গত বছরের তুলনায় এবার বাজারে পাটের দামও বেড়েছে। মান ও প্রকারভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কৃষকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার মণপ্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। ভালো ফলনের সঙ্গে বাড়তি দাম পাওয়ায় উৎপাদন খরচ পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তারা।
সপ্তাহে ৫০ লাখ টাকার পাটের হাট
বিরামপুর উপজেলার কাটলা বাজারে সপ্তাহে তিন দিন বসে পাটের হাট। নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সকাল থেকেই হাটে দেখা যায় পাটের বড় বড় স্তূপ। বিরামপুরের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের ইউনিয়ন ও গ্রাম থেকে কৃষকেরা পাট নিয়ে আসেন এখানে।
কৃষকের পাশাপাশি পাইকার ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে সকাল থেকেই জমে ওঠে পাটের কেনাবেচা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, কাটলা বাজারে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ টাকার পাট কেনাবেচা হয়। সে হিসাবে মাসে এ হাটে পাটের লেনদেন দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোকামে পাটের চাহিদা থাকায় এবার স্থানীয় বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফলে কৃষকেরা তুলনামূলক ভালো দাম পাচ্ছেন।
কৃষক লগেন পাহান বলেন,
“এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। গত বছরের তুলনায় বাজারেও ভালো দাম পাচ্ছি। ফলন ও দাম দুটো ভালো থাকায় আমরা খুশি।”
খরচ বেশি, তবুও লাভের আশায় কৃষক
পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি থেকে শুরু করে পাট কাটার পর জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানো পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষকদের ব্যয় করতে হয়।
কৃষকেরা জানান, এবার পাট কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। তবে ভালো ফলন ও বাজারে তুলনামূলক বেশি দাম পাওয়ায় সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে লাভের আশা করছেন তারা।
পাট কাটার পরপরই শুরু হয় জাগ দেওয়ার কাজ। ভালোভাবে জাগ দিতে পারলে আঁশের মান উন্নত হয় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। তাই পাট কাটার পাশাপাশি জলাশয়ে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা।
‘মোকামে চাহিদা থাকায় দাম ভালো’
কাটলা বাজারের পাইকারি পাট ব্যবসায়ী মো. সুলতান মাহবুদ বলেন,
“কাটলা বাজারে সপ্তাহে তিন দিন পাটের হাট বসে। সপ্তাহে প্রায় ৫০ লাখ টাকার পাট কেনাবেচা হয়। এবার মোকামে চাহিদা থাকায় পাটের দামও ভালো।”
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে চাহিদা থাকায় চলতি মৌসুমে পাটের বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। মৌসুমের শেষ পর্যন্ত বর্তমান বাজারদর থাকলে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই লাভবান হবেন বলে আশা তাদের।
জেলায় ৪ হাজার ১৭২ হেক্টর জমিতে পাট
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দিনাজপুর জেলার ১৩টি উপজেলায় মোট ৪ হাজার ১৭২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এরই মধ্যে জেলার প্রায় ৬০ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে।
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি অফিসের কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার মো. মেজবাহুর রহমান বলেন,
“এবার জেলার ১৩টি উপজেলায় ৪ হাজার ১৭২ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ভালো ফলনের আশা করছি।”
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি পাট ও পাটজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদাও রয়েছে। কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পেলে এ অঞ্চলে পাট চাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
তবে কৃষকদের লাভ ধরে রাখতে উৎপাদন খরচ কমানো, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং পাট সংরক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে মাঠে পাট কাটা, জলাশয়ে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানো থেকে শুরু করে হাটে বিক্রি—প্রতিটি ধাপেই এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন হাকিমপুর ও বিরামপুরের কৃষকেরা। বাম্পার ফলনের সঙ্গে গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দাম পাওয়ায় সোনালি আঁশের এবারের মৌসুমে কৃষকের মুখে ফুটেছে স্বস্তির হাসি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন