বিশ্বের
অন্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস-২০২৬ পালিত হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে একত্র করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সমৃদ্ধ করতে, পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি এবং আরো শান্তিপূর্ণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল সমাজ গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে জাতিসংঘের গণতন্ত্র তহবিল ও জাতিসংঘের অংশীদারিত্ব বিষয়ক দপ্তর আজ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন মত ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পরামর্শভিত্তিক গণতন্ত্র কীভাবে মানুষের ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মালিকানাবোধ বাড়াতে পারে, সেটাও তুলে ধরার কথা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাবেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হবে এবং অংশগ্রহণ, সংলাপ ও অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে কীভাবে আস্থা বাড়ানো এবং আরো জনমুখী, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর শাসনব্যবস্থায় অবদান রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।
শাসনব্যবস্থা জনগণকে, তাদের জীবনকে প্রভাবিত করে— এমন সিদ্ধান্তে অর্থবহভাবে প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংলাপ, সহযোগিতা এবং ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমাজের কোনো মানুষ যাতে পিছিয়ে না থাকে, তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
গত ফেব্রুয়ারিতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করায় বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থান ফিরে পাচ্ছে।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুনরুজ্জীবিত গণতন্ত্র এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির অধীনে সুশাসন ও আইনের শাসনের মাধ্যমে নতুন গতিপথ তৈরি করছে। ফলে, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন যে গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, এখন তারা সেই গণতন্ত্রের মূল্য উপলব্ধি ও অনুভব করতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া দৃশ্যমান হয়েছে। সংসদে বিরোধী মতের উপস্থিতি রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো কর্মসূচি আয়োজন এবং সরকারের নীতির সমালোচনা করতে পারছে। ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও আগের তুলনায় বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
সরকারের সমালোচনাও এখন আরো প্রকাশ্য। এমনকি কোনোপ্রকার ভয়-ভীতি ছাড়াই ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও রাজনৈতিক কার্টুন প্রকাশিত হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবেশের এই পরিবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও দীর্ঘদিনের পরিপ্রেক্ষিতে এর গণতান্ত্রিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।ৎ
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি সরকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ সময়ে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পাওয়া যায়নি; রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গণমামলার কোনো অভিযোগও ওঠেনি। একই সঙ্গে সরকারের সমালোচনা প্রকাশের কারণে কোনো সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার খবরও পাওয়া যায়নি।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার জনপরিসরের অংশ হিসেবে বহাল রয়েছে। একই সঙ্গে বিরোধী মতের ওপর পরিকল্পিত রাজনৈতিক হয়রানির কোনো বিশ্বাসযোগ্য খবরও পাওয়া যায়নি। এসব অগ্রগতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিমূলক শাসনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভয়ের পরিবেশ থেকে নতুন করে গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার দিকে এগিয়েছে। এই যাত্রা এখনো সম্পূর্ণ হয়নি এবং সামনে অবশ্যই নানা চ্যালেঞ্জ থাকবে। তবে, এর দিকনির্দেশনা স্পষ্ট। নির্বাচন আবারও অর্থবহ হয়ে উঠেছে। বিরোধী রাজনীতি তার জায়গা ফিরে পেয়েছে। সরকারের সমালোচনা আরো প্রকাশ্য হয়েছে। ব্যালটের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। আর নতুন নেতৃত্ব সাদাসিধে জীবনযাপন, মানবিকতা, সহনশীলতা ও সংযমকে সুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আজ এক বাণীতে বলেছেন, গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলে কোনো স্বৈরাচারী শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।
এছাড়া বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের জন্য ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আর গঠনমূলক সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিরোধিতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, রক্তের স্রোত পেরিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে গণতন্ত্রের বিজয়যাত্রা শুরু হয়েছিল।
পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারির অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাই এটি রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আরো বলেন, গণতন্ত্র রক্ষায় সরকার, গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখা এবং গণতন্ত্রকে আরো শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দাবি ও মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বানও জানান তিনি।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, বহু রক্তক্ষয়ী আন্দোলন, ত্যাগ ও কঠিন সংগ্রামের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি বলেন, তাই যেকোনো মূল্যে আমাদের এই গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
সংসদে বর্তমানে গণতন্ত্রের চর্চা সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ও সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেভাবে বিরোধী দলের মতামত শুনছেন, তা গত ১৭ বা ১৮ বছরে দেখা যায়নি।
তিনি আরো বলেন, অতীতে সংসদকে ফ্যাসিবাদ ও দমন-পীড়নের হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে এখন বিরোধী দল প্রকাশ্যে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারছে।
তবে, বিরোধিতার নামে কোনো অশালীন, অসভ্য বা ‘অশোভন’ শব্দ ব্যবহার না করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা বিএনপি সরকারের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য।
দেশের বর্তমান অবাধ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশকে স্থায়ী রূপ দিতে বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও গণমাধ্যমের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখা অত্যন্ত জরুরি বলে জানান তিনি।
দিবসটি উপলক্ষ্যে সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. মো. শফিকুর রহমানও আজ এক বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার গণতন্ত্রকে কবর দিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘মানুষ তাদের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।’
জনগণের মৌলিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণতন্ত্রকে উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই বিপ্লব (জুলাই গণঅভ্যুত্থান) ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য জাতির যে আকাঙ্ক্ষা, তা পূরণ করতে হবে।’
বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি) সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক আজ বাসস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এখন মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে এবং সারাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবাধ রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ভোট বা নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টানা তিনটি নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নিয়েছিল। গণতন্ত্রের নামে তিনি যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্র।’
সাইফুল হক বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল— মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যাতে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক দল কোনো ধরনের চাপ বা হুমকি ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। দেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা এখন বিস্তৃত হওয়ায় সেই সুযোগ বর্তমানে তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৭ বছরব্যাপী স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং এরপর দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে জনগণ তাদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত অধিকার ফিরে পেয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয় উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা বলেন, এরপর থেকে দেশে এক ধরনের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় সাত মাস পার হয়েছে এবং কোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর এই প্রথম দেশে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেনি।
সাইফুল বলেন, এক-দু’টি ঘটনা ছাড়া এই দীর্ঘ সময়ে গুম, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেফতারের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
এর ফলে দেশ আগের রাজনৈতিক ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা ও প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা এখন বিস্তৃত হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান দিক হলো— রাজনৈতিক বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত করা উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, বর্তমানে প্রধান বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা সংসদের ভেতরে ও বাইরে যেভাবে সরকারের সমালোচনা করছেন, তাতে স্পষ্ট যে তারা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদেরও স্বাধীনভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে। আগে এই সুযোগ ছিল না। এখন দেশের সর্বত্রই স্বাধীনতা রয়েছে।
-বাসস
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন