ঢাকাই চলচ্চিত্রে অনেক সিনেমা নির্মিত হয়েছে, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছে। তবে কিছু সিনেমা দর্শকের স্মৃতিতে রয়ে গেছে, হয়ে উঠেছে সময়ের প্রতিচ্ছবি। ১৯৯১ সালের ৪ অক্টোবর মুক্তি পায় ‘চাঁদনী’ সিনেমা। মুক্তির পর দর্শকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং ‘সুপারহিট’ তকমা পায়।
‘চাঁদনী’ সিনেমার মাধ্যমে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে নাঈম ও শাবনাজের। তারপর কেটে গেছে ৩৫ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে চলচ্চিত্রের অনেক কিছু বদলে গেছে, তবে নাঈমের স্মৃতিতে ‘চাঁদনী’ সিনেমার দিনগুলো আজও অমলিন।
গুণী নির্মাতা এহতেশামের হাত ধরে চলচ্চিত্রে পা রাখেন নাঈম ও শাবনাজ। ‘চাঁদনী’ ছিল তাদের প্রথম সিনেমা এবং পর্দায় প্রথম জুটি। সিনেমাটির সাফল্যের পর দ্রুতই দর্শকের প্রিয় জুটি হয়ে ওঠেন তারা। পরবর্তীতে ‘ফুল আর কাঁটা’, ‘জিদ’, ‘লাভ’, ‘দিল’ ও ‘টাকার অহংকার’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেন নাঈম-শাবনাজ।
তবে ‘চাঁদনী’ সিনেমার শুরুটা ছিল আকস্মিক। নাঈমের পরিবারের সঙ্গে পরিচালক এহতেশামের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। একদিন নাঈমকে দেখে তার মধ্যে নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা খুঁজে পান এহতেশাম। এরপর তাকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। পরে শাবনাজের বাসায় গিয়ে তাকে নায়িকা হিসেবে নির্বাচন করেন। এভাবেই তৈরি হয় ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি নাঈম-শাবনাজ।
‘চাঁদনী’ সিনেমার শুটিং শুরুর আগেই সিনেমাটির গানগুলো রেকর্ড করা হয়েছিল। এরপর জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় মহরত। আর নাঈমের চলচ্চিত্রজীবনের প্রথম শুটিংও ছিল এই সিনেমার জন্য। সেই দিনের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট নাঈমের মনে। তিনি বলেন, “মহরতের স্মৃতি ভুলব না। আজও চোখে ভাসে। প্রথম শুটিং করি বারিধারায়। দিনটি ছিল আমার জন্য স্মরণীয়।”
ঢাকায় শুটিংয়ের পর ‘চাঁদনী’ সিনেমার পুরো দল চলে যায় সিলেটের জাফলংয়ে। সেখানে বেশ কয়েক দিন চলে সিনেমাটির দৃশ্যধারণ। তখনকার জাফলং আজকের মতো ছিল না। সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগও ছিল না। ফলে রাতের শুটিংয়ে ভরসা ছিল হ্যাজাক বাতি।
সেই সময়ের আরো একটি মজার স্মৃতি রয়েছে নাঈমের। যে বাড়িতে সিনেমার দল থাকত, সেখানে ছিল একটি পুকুর। দলের প্রায় সবাই সেই পুকুরে গোসল করলেও নাঈম নামতেন না। কারণ ছিল জোঁকের ভয়। শুটিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন ছোট ছোট ঘটনাই এখন তার কাছে হয়ে উঠেছে অমূল্য স্মৃতি।
প্রথম সিনেমা মুক্তির আগের রাতটিও ছিল নাঈমদের জন্য অন্যরকম উত্তেজনার। নিজেদের প্রথম সিনেমা দর্শকের সামনে কেমন সাড়া ফেলবে, তা নিয়ে সবার মধ্যেই ছিল উৎকণ্ঠা। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে নাঈমসহ দলের কয়েকজন রাতে ঢাকার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ঘুরে বেড়ান। ব্যানার-পোস্টার ঠিকঠাক আছে কি না, সেটিও নিজেরা দেখে নেন। এভাবে রাতভর ব্যস্ততার পর ভোরের দিকে বাসায় ফিরেন তারা।
সিনেমা মুক্তির আগে দলের আরেকটি অংশ সিলেটে গিয়ে হজরত শাহজালালের মাজার জিয়ারত করেছিল। প্রথম সিনেমা নিয়ে সবার মনে তখন একদিকে যেমন ছিল উত্তেজনা, অন্যদিকে তেমনই ছিল প্রার্থনা ও প্রত্যাশা।
শেষ পর্যন্ত দর্শকের ভালোবাসায় ‘চাঁদনী’ সিনেমা সফল হয়। সিনেমাটির সাফল্যের সঙ্গে নাঈম-শাবনাজ জুটিও জায়গা করে নেয় দর্শক হৃদয়ে। পরবর্তীতে একের পর এক সিনেমায় তাদের জুটি জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ‘চাঁদনী’ নিয়ে দর্শকের আগ্রহ কমেনি। বরং পুরোনো দিনের সিনেমা ও জুটির কথা উঠলেই ফিরে আসে এই সিনেমার নাম। নাঈমের কাছেও তাই ‘চাঁদনী’ শুধু ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা নয়, তার চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিগুলোর একটি।
এ বিষয়ে নাঈম বলেন, “এখনো দর্শকরা সিনেমাটির কথা বলেন, মনে রেখেছেন—এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন