দিনাজপুরের বিরলে মাত্র ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দঁাড়িয়েছে ৩০২ জনে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদ্যালয়ের পরিবেশ উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে বিদ্যালয়টিকে এগিয়ে নেওয়ার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক’ সম্মাননা পেয়েছেন ব্রহ্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ তাজ আল মিনার।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ের গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্মাননা প্রদান করেন।
জানা যায়, বিরল উপজেলার ব্রহ্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৭ সালের ২১ মে মোঃ তাজ আল মিনার প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সে সময় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ২৬ জন। দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি, পাঠদানের মানোন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং বিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেন। এর ফলে ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে বিদ্যালয়ের সার্বিক চিত্র। বর্তমানে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়ে ৩০২ জনে দঁাড়িয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৮ সালে তাজ আল মিনার বিরল উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। এরপর ২০২৩ সালে দিনাজপুর জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। ২০২৪ সালে ব্রহ্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অর্জন করে শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ের মর্যাদা। ২০২৫ সালে তাজ আল মিনার দিনাজপুর জেলার শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তিনি জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন।
জাতীয় পর্যায়ে সম্মাননা পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় প্রধান শিক্ষক মোঃ তাজ আল মিনার বলেন, ‘এই অর্জন শুধু আমার একার নয়। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি এলাকাবাসী, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সহকর্মী শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৭ সালে বিদ্যালয়ে যোগদানের সময় শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ২৬ জন। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৩০২ জন হয়েছে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।’
শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, তাজ আল মিনার প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সানজিদা আরিফিন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য তিনি শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে নিয়মিত স্টাফ মিটিং করেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।’
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধীন চন্দ্র সরকার বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক তাজ আল মিনার একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক ও ভালো মানুষ। তঁার মধ্যে একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজনীয় গুণাবলি রয়েছে। তঁার এই অর্জন বিরলের প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের জন্য গর্বের।’
বিরল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোর্শেদা খাতুন বলেন, জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক হিসেবে তাজ আল মিনারের সম্মাননা অর্জন বিরলের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। তঁাকে জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত করায় প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।
বিরল উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রেজাউল ইসলাম বলেন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ব্রহ্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাজ আল মিনার জাতীয় পর্যায়েও গুণী শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটি বিরল উপজেলার জন্য অত্যন্ত সম্মানের ও আনন্দের বিষয়। তঁার মতো অন্যান্য শিক্ষকও নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
স্থানীয়দের মতে, একজন প্রধান শিক্ষকের আন্তরিক উদ্যোগ, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ব্রহ্মপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন একটি অনুকরণীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মাত্র ২৬ জন শিক্ষার্থী থেকে ৩০২ জনে পেঁৗছানোর এই অগ্রযাত্রা বিরলের শিক্ষা অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন