বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেবী দুর্গার আগমন বার্তা বহনকারী শুভ তিথি ‘মহালয়া’ আজ শনিবার নানা ধর্মীয় আচার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে।
মহালয়া উপলক্ষে দেশের অন্যান্য পূজামণ্ডপের মতো ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, রমনা কালীমন্দির, স্বামীবাগে লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম মন্দিরসহ দেশের বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে মহালয়ার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে শনিবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে মহালয়া অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি কামনায় তিল-তর্পণ অনুষ্ঠান। এর পরবর্তীতে মহালয়ার ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজা করা হয়। আর এর মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষ শুরু হলো।
সকালে শ্রীশ্রী চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। এই ‘চন্ডী’তেই রয়েছে দেবী দুর্গার সৃষ্টির বর্ণনা এবং দেবীর প্রশস্তি।
মহালয়ার দিনেই দেবী দুর্গা কৈলাসের আবাস ছেড়ে মর্ত্যলোকে তাঁর পিত্রালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন, যা পরে দুর্গাপূজা উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়।
দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে সকাল ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এক ঘণ্টার একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আমন্ত্রিত অতিথিরা ‘মঙ্গল প্রদীপ’ প্রজ্বলন করেন।
একদল সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পী শ্রী শ্রী চন্ডীপাঠ ও ভক্তিগীতি পরিবেশনের মাধ্যমে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেন।
এরপর পূর্বপুরুষদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনায় তিল-তর্পণ ও মহালয়া ঘট স্থাপন করা হয় এবং জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন মন্দিরেও নানা আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে রমনা কালী মন্দির, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন, উত্তরা সর্বজনীন মন্দির ও সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পূজা ও ব্রাহ্মণদের বস্ত্র দানের মাধ্যমে তাদের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত সাধন চক্রবর্তী জানান, এ বছর দেবী দুর্গা ঘোড়ায় (ঘোটক) চড়ে মর্ত্যে আসবেন এবং নৌকায় চড়ে বিদায় নেবেন।
মহালয়ার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো পবিত্র ‘শ্রী শ্রী চন্ডী’ পাঠ ও ভক্তিগীতি পরিবেশন, যার মাধ্যমে অশুভ শক্তির ওপর দেবী দুর্গার শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরা হয়।
এদিকে মহালয়া উপলক্ষে শনিবার সকালে রাজধানীর বনানী মাঠে গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশন ‘মহালয়া ১৪৩৩’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ‘মহালয়া ১৪৩৩’-এর উদ্বোধন করেন।
এ সময় মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরুর বিভাজন নয়, পরিচয় হবে বাংলাদেশি।’
তিনি বলেন, রাষ্ট্র, সমাজ এবং সরকারের কাছ থেকে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার, সমান নিরাপত্তা, সমান স্বাধীনতা এবং সমান মর্যাদা পাবেন। নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের এই অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করাই সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।
এর আগে সকাল ৬ টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন বনানী মাঠে পৌঁছালে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান এবং উত্তরীয় পরিয়ে দেন গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের নেতৃবৃন্দ। পরে বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন কুমার বাধে, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন কান্তি মজুমদার, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের সভাপতি অলোক সাহা, সাধারণ সম্পাদক বিনয় গোপাল রায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতিটি বাঙালি হিন্দু পরিবারে মহালয়ার ভোরে প্রথা অনুযায়ী ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র (অশুভ শক্তি মহিষাসুর বিনাশের আখ্যান) রেকর্ড করা অনুষ্ঠানটি বাজানো হয়।
আগামী ১৬ অক্টোবর ‘মহাসষ্ঠী পূজা’র মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। এরপর যথাক্রমে মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমী পালিত হবে এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন