চারদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ। দুর্গম রহমতপুর দেবারিখোলা অষ্ট আশির চরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র ভরসা খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেই বিদ্যালয়টি রাতারাতি ভেঙে লুট করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
গত ১ অক্টোবর ভবনটি ভেঙে নেওয়ার পর পাঠদান নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এর মধ্যেই গত সোমবার থেকে শুরু হয়েছে পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা। বিদ্যালয় না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। প্রশ্ন উঠেছে, একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ভেঙে ফেলা হলো?
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙনের অজুহাতে বিদ্যালয় ভবনটি ভেঙে নেওয়া হয়। চর ডিজাইনের বিদ্যালয়টি বারান্দাসহ টার রুমবিশিষ্ট। বিদ্যালয়টির পাশাপাশি সদ্য নির্মিত ওয়াশ ব্লকের ইটও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মোট ৩৭ লাখ টাকার সরকারি এই সম্পদ অপসারণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যালয় ভবন ভাঙার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হলে যথাযথ মূল্যায়ন ও বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। তবে কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের খেওয়ার আলগা চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই এবং ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।
স্থানীয় আবু বকর, সাহেব আলী ও রোস্তম মিয়া অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ দেখিয়ে ভেঙে নেওয়া হলেও আশপাশে থাকা কয়েকটি বাড়ি এখনও অক্ষত রয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার হোসেনের বাড়ি ও ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের বাড়িও রয়েছে বলে তারা জানান। ফলে বিদ্যালয়টি ভাঙার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা এবং এর পেছনে প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা আমাদের বোধগম্য নয়। বিদ্যালয়টির ভাঙা কিছু জিনিস পাশে রেখে বাকিগুলো নদীগর্ভে বিলীনের নাটক সাজিয়েছেন ছাইফুর মেম্বার। আমরা এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
বিদ্যালয় ভবন না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে শিশুরা। চরের দুর্গম অবস্থানের কারণে অন্য এলাকায় গিয়ে পড়াশোনা করাও তাদের জন্য কঠিন। পঞ্চম শ্রেণির মডেল টেস্ট পরীক্ষা শুরু হলেও পরীক্ষা ও পাঠদানের জন্য কোনো পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। খোলা আকাশের নিচে বেঞ্চ বসিয়ে চলছে কার্যক্রম। এতে উদ্বেগ বেড়েছে অভিভাবকদের। দ্রুত বিকল্প ক্লাসরুমের ব্যবস্থা না হলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করছেন অভিভাবকরা।
দুর্গম চরাঞ্চলে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম নানা সংকটে পড়ে। তার ওপর একমাত্র বিদ্যালয়টি ভেঙে ফেলায় শিশুদের শিক্ষাজীবন নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। একটি সরকারি বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে নেওয়ার অভিযোগ শুধু অবকাঠামো হারানোর ঘটনা নয়; এটি সরকারি সম্পদের সুরক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এনেছে। বিদ্যালয়টির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুর ইসলাম জানান, এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই সরকারের অনুমতি না নিয়ে বিদ্যালয়টি ভাঙা মোটেও ঠিক হয়নি।
অভিযুক্ত যাত্রাপুর ইউপি সদস্য ছাইফুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যায় । কুড়িগ্রাম সদরের প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অনুমোদন ছাড়া বিদ্যালয় ভবন ভাঙার বিষয়টি গুরুতর অপরাধ। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুড়িগ্রাম সদরের ইএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, অনুমতি ছাড়া খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙার বিষয়টি তদন্ত করা হবে। তদন্তে প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন