ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অসময়ের তরমুজ চাষ করে এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন নীলফামারীর কৃষক ওমর আলী (৪৫)। গতানুগতিক চাষাবাদের বাইরে গিয়ে নতুন প্রযুক্তিতে ভিন্ন জাতের তরমুজ ফলিয়ে তিনি এখন স্থানীয় অন্য সব কৃষকদের আলোচনার কেন্দ্রে।
নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের পূর্ব ডাঙাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক চোখজুড়ানো দৃশ্য। ওমর আলীর ৩ বিঘা জমিতে বাঁশের মাচায় ঝুলছে থোকা থোকা হলুদ, গাঢ় সবুজ ও ডোরাকাটা রঙের তরমুজ। পোকার আক্রমণ ও রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে প্রতিটি তরমুজ সযত্নে নেট (জালি) দিয়ে বেঁধে মাচায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
যেভাবে শুরু ও খরচের হিসাব:
কৃষক ওমর আলী জানান, আগে তিনি জমিতে শসা চাষ করতেন। তবে অনলাইনে অসময়ে মাচায় তরমুজ চাষের সফলতার ভিডিও দেখে তিনি দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হন। এরপর ঢাকার একটি অভিজ্ঞ বীজ সরবরাহকারী কোম্পানির মাধ্যমে 'কিং সুগার' ও 'সূর্য ডিম' জাতের মোট ৬ হাজার চারা সংগ্রহ করে ৩ বিঘা জমিতে রোপণ করেন।
তিনি জানান, জমি প্রস্তুত, মাচা তৈরি, চারা ক্রয়, নেট ও পরিচর্যা বাবদ এ পর্যন্ত তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা।
আয়ের সম্ভাবনা ও বাজারজাতকরণ:
বর্তমানে তরমুজ গাছের বয়স ৬০ দিন। আবহাওয়া ও সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আর ১০ দিন পরই (গাছের বয়স ৭০ দিন হলে) ক্ষেত থেকে তরমুজ তোলা শুরু হবে।
হিসাব তুলে ধরে ওমর আলী আশা প্রকাশ করে বলেন:
গড় ওজন: প্রতিটি তরমুজের ওজন গড়ে প্রায় ৩ কেজি হতে পারে।
বিক্রয়মূল্য: বাজারে অসময়ের এই তরমুজের প্রতি কেজি পাইকারি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব।
প্রত্যাশিত বিক্রি: সব তরমুজ সঠিকভাবে বিক্রি করতে পারলে প্রায় ৯ লাখ টাকা আয় হবে।
মোট লাভ: উৎপাদন খরচ বাদ দিলে মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসে তাঁর নীট লাভ হতে পারে প্রায় ৬ লাখ টাকা।
ইতিমধ্যেই উৎপাদিত এই প্রিমিয়াম জাতের তরমুজ বিক্রির জন্য ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কারওয়ান বাজারের বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ সম্পন্ন করেছেন তিনি।
স্থানীয়দের উৎসাহ ও চাষের চ্যালেঞ্জ:
অসময়ে মাচায় তরমুজের বাম্পার ফলন দেখে অভিভূত স্থানীয় অন্যান্য কৃষকরাও। এলাকার কৃষক জগদীশ রায় বলেন, "আমাদের এলাকায় মাচা তৈরি করে এভাবে রঙিন ও অসময়ের তরমুজ চাষ আগে কেউ করেনি। ওমর আলীর ক্ষেতের সুন্দর অবস্থা দেখে এখন গ্রামের অনেক কৃষকই আগামীতে এই তরমুজ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।"
তবে এই নতুন চাষাবাদে কিছু ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ওমর আলী জানান, অসময়ের কারণে ফলের বোঁটা পচে যাওয়া, ছত্রাকের আক্রমণ এবং সঠিক মাত্রায় সুষম সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য:
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, "অফ-সিজনে বাজারে তরমুজের প্রচুর চাহিদা ও চড়া দাম থাকে। আমাদের কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ওমর আলীর তরমুজ ক্ষেত পরিদর্শন করেছেন। ফলের রোগবালাই রোধ ও মানসম্মত ফলনের জন্য তাঁকে প্রয়োজনীয় সমস্ত কারিগরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।"
মাচায় অসময়ের রঙিন তরমুজ চাষ নীলফামারীর কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন