দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের নারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩২ বছর শিক্ষকতা করেছেন আলহাজ্ব শাহ মো. হেলাল উদ্দিন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু তিনি কাটিয়েছেন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান, শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, মাঠ আর পরিচিত আঙিনা- সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অসংখ্য স্মৃতি। তাই বিদায়ের দিনে তাকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আয়োজনে বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিদায় শিক্ষক আলহাজ্ব শাহ মো. হেলাল উদ্দিন শিক্ষকতার পাশাপাশি অত্র বিদ্যালয়ে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাই তার শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতার সাথে যোগ হয়েছে এক অনন্য স্মারক।
একসময় গ্রামবাংলার সামাজিক ও পারিবারিক নানা আয়োজনে ঘোড়ার গাড়ির ছিল বিশেষ কদর। বিয়ে, বরযাত্রা কিংবা আনন্দঘন কোনো অনুষ্ঠানে ঘোড়ার গাড়ি ছিল আভিজাত্য, সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক। সময়ের পরিবর্তনে মোটরযানের দাপটে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই বিরল। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এই বাহন আজ অনেকের কাছে স্মৃতির অনুষঙ্গ। এমন এক সময়ে শিক্ষককে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানোর আয়োজন যেন পুরোনো দিনের সেই ঐতিহ্যকেই ফিরিয়ে আনল নতুন আবহে।
তবে এই আয়োজনের রাজকীয়তা শুধু ঘোড়ার গাড়িতে নয়; এর গভীরে রয়েছে একজন শিক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বার্তা। দীর্ঘ ৩২ বছরের কর্মজীবন শেষে বিদায়ের দিনে এমন আয়োজন একজন শিক্ষকের অর্জিত সম্মানকে দৃশ্যমান করে তোলে। শিক্ষকতা এমনই এক পেশা, যার সাফল্য শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীদের মনে জায়গা করে নেওয়া, তাদের জীবনে মূল্যবোধের বীজ বুনে দেওয়া এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়াই এর বড় অর্জন। পরে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আলহাজ্ব শাহ মো. হেলাল উদ্দিন। তার আবেগে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও হৃদয়স্পর্শী পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এসময় তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। সততা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে দেশ ও সমাজের কল্যাণে শিক্ষার্থীদের কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
নারায়ণপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, “ফুলের মালা,সম্মাননা স্মারক, মানপত্র ও বিভিন্ন উপহার দিয়ে তাঁকে রাজকীয় বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পরে সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এলাকার বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তাঁকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।” এমন ব্যতিক্রমী বিদায় সংবর্ধনা পুরো এলাকাজুড়ে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন