শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আগামী ২০ অক্টোবর রংপুর নগরীর ঐতিহাসিক ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শনে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত সফরসূচিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আনন্দ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সফরটিকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থানের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রংপুরের জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরাও সফর সফল করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান জানান, প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, রংপুর নগরীর স্টেশন রোডে অবস্থিত ধর্মসভা মন্দির (রাধা গোবিন্দ মন্দির) পরিদর্শনের কথা রয়েছে। এ ছাড়া শ্রী শ্রী করুণাময়ী কালীবাড়ী মন্দির ও গুপ্তপাড়া মন্দিরও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, সফরসূচি অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানযোগে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। সেখান থেকে সড়কপথে রংপুর নগরীর উদ্দেশে রওনা দেবেন তিনি। বেলা ১১টার দিকে তাঁর ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শনের কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও প্রস্তুতি কার্যক্রমও চলছে।
রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী ডন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। সফর সফল করতে দলীয়ভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজধানীর বাইরে শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রধানমন্ত্রীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে তাঁদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।
ধর্মসভা মন্দিরের সভাপতি ভবোতোষ সরকার বলেন, দুর্গাপূজার সময় প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্দিরে আসছেন—এটি তাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয়।
তার ভাষ্য, এর আগে দুর্গাপূজা উপলক্ষে কোনো প্রধানমন্ত্রী রংপুরে এসে মন্দির পরিদর্শন করেছেন বলে তাদের জানা নেই। তাই প্রথমবারের মতো এমন একটি সফরের খবরে মন্দির-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষ উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
ভবতোষ সরকার বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের মন্দিরে আসছেন। তাই আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্রশাসন ও বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় হচ্ছে। হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করার প্রস্তুতি চলছে আমাদের।”
মন্দিরের পুরোহিত বেনী মাধব চক্রবর্তী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনের খবরে মন্দির এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভক্তদের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে।
তিনি বলেন, “দুর্গাপূজায় মন্দির পরিদর্শনে দেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো রংপুরে আসছেন—এটি আমাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। তিনি মন্দিরে আসছেন, এটাই আমাদের বড় পাওয়া। প্রধানমন্ত্রীর এই পরিদর্শন রংপুরের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
রংপুরের কামালকাছনা এলাকার অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক রজনীকান্ত বর্মন (৭৮) জানান, প্রধানমন্ত্রীর রংপুরের ঐতিহাসিক ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শনকে ঘিরে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা, আনন্দ ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই সফর ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা আরও জোরালো করবে।
মন্দির কমিটির সদস্য ও স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, রংপুর নগরীর স্টেশন রোডে জাহাজ কোম্পানি এলাকার পাশে অবস্থিত ধর্মসভা মন্দির উত্তরাঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এটি রাধা গোবিন্দ মন্দির নামেও পরিচিত। ১৮৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ, সভা-সমাবেশ এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।
মন্দিরটির ইতিহাস কেবল ধর্মীয় উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠার পর এখানে ধর্মচর্চার পাশাপাশি ‘রঙ্গপুর চতুষ্পাঠী’র মাধ্যমে সংস্কৃত শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে, ১৯০৫ সালের দিকে মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটি সাধারণ পাঠাগার ও জ্ঞানচর্চার পরিসর গড়ে ওঠে। এসব উদ্যোগ তৎকালীন রংপুরের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনেও ভূমিকা রেখেছিল।
শারদীয় দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে মন্দির প্রাঙ্গণে নানা আয়োজন হয়ে থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মন্দির স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় চর্চা ও সামাজিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন