শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দিনাজপুরের হিলি সীমান্তে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষ সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি জড়ো হয়েছেন ভারতের পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা দেখার টানে। কেউ কেউ ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের আশায় এলেও সীমান্তে কড়াকড়ির কারণে কাছে যেতে না পেরে আক্ষেপ নিয়ে ফিরছেন বাড়ি। দূর থেকে স্বজনদের দেখা, হাত নেড়ে অভিবাদন জানানো কিংবা মুঠোফোনে কথা বলেই মেটাতে হচ্ছে তাদের মনের আকুতি।
দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত দেশের অন্যতম পরিচিত একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। এখান থেকে ভারতের ভূখণ্ড অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। দুই দেশকে কাঁটাতারের বেড়া আলাদা করে রাখলেও দুই পাড়ের মানুষের হৃদয়ে রয়েছে গভীর আত্মীয়তার শেকড়। বাংলাদেশে যেমন ভারতের বহু মানুষের স্বজনরা রয়েছেন, তেমনি ভারতেও রয়েছে এ দেশের মানুষের আপনজনেরা। এ কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে হিলি সীমান্তে মানুষের আনাগোনা থাকে, তবে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এই ভিড় বহুগুণ বেড়ে যায়।
এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। পূজা শুরুর পর থেকেই প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে দর্শনার্থী ও পূজারীরা আসছেন হিলি সীমান্তে। কেউ এসেছেন ভারতের পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা দেখতে, আবার কেউ ছুটেছেন ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায়। অনেকের মাঝেই ভুল ধারণা ছিল যে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে সীমান্ত পারাপারে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। সেই প্রত্যাশায় ভিড় জমান অনেকে। তবে যথাযথ নিয়ম ও বৈধ অনুমতি না থাকায় তাদের অনেকেরই স্বজনদের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ মেলেনি।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থেকে হিলি সীমান্তে বেড়াতে আসা কল্পনা রানী বলেন, ‘একটা বছর অপেক্ষা করি দুর্গাপূজার জন্য। এবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে হিলি সীমান্তে এসেছি। ভেবেছিলাম, ভারতের প্রতিমা দেখবো এবং ওপারে থাকা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে কথা বলবো। কিন্তু সীমান্তের শূন্যরেখার কাছাকাছি এসেও তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারছি না, ভারতের প্রতিমাও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না। ওপারে অনেক আত্মীয়স্বজন থাকলেও তাদের সঙ্গে দেখা করতে না পারাটাই সবচেয়ে কষ্টের।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যদি পূজার সময় এক-দুই ঘণ্টার জন্য হলেও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা বা কথা বলার ব্যবস্থা করে দিতো, তাহলে অনেক ভালো লাগতো। অনেক দিন পর তাদের দেখতে পারতাম, মনের কথা বলতে পারতাম। এতে আমাদের অনেক আনন্দ হতো।’
বগুড়ার আদমদীঘি থেকে আসা পূজা বসাক জানান, অনেক দূর থেকে তিনি হিলি সীমান্তে এসেছেন ভারতের প্রতিমা দেখতে এবং সীমান্ত এলাকার পরিবেশ কেমন তা জানতে। কিন্তু এসে দেখলেন এপার থেকে ওপারে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাঁটাতারের বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে বিজিবির কড়াকড়ির কারণে ওপারে যাওয়ার উপায় ছিল না। সীমান্ত থেকে ভারতীয় প্রতিমা দেখা গেলেও সেখানে গিয়ে সরাসরি তা উপভোগ করার সুযোগ না থাকায় মনে আক্ষেপ রয়ে গেছে তার।
নীলফামারী থেকে আসা পূর্ণিমা রানী বলেন, ‘সীমান্তের ওপারে ইটাহার এলাকায় আমার নানির বাড়ি, খুব কাছেই। তাই হিলি সীমান্তে এসেছিলাম, যদি তাদের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। কিন্তু দুই দেশের সীমানাবেড়ার কারণে সেখানে যেতে পারিনি। বিষয়টি খুব মিস করছি, খারাপও লাগছে। অন্তত সামনের পূজামণ্ডপ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পেলে স্বজনদের দেখতে পেতাম, অনেক ভালো লাগতো।’
ঝর্ণা রায় নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘শুনেছিলাম, দুর্গাপূজার সময় সীমান্ত দিয়ে মানুষকে পারাপারের সুযোগ দেওয়া হয়। ভারতে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন রয়েছেন। তাদের সঙ্গে দেখা ও কথা বলতে পারব, সেই আশায় হিলি সীমান্তে এসেছিলাম। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া পর্যন্ত যাওয়ার পর আর সামনে যেতে পারিনি। তাদের কারও সঙ্গে দেখা না হওয়ায় মনের মধ্যে কষ্ট রয়ে গেছে।’
বাবা-মায়ের সঙ্গে হিলি সীমান্তে আসা কিশোরী কল্পনা রানী বলে, ‘ভারতে আমার দাদুবাড়ি। তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্য সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে এসেছি। কাছে যেতে না পারলেও দূর থেকে তাদের দেখতে পারা এবং হাত নেড়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারাটাও অনেক শান্তির। যদি একটু কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেতাম, তাদের ছুঁতে পারতাম কিংবা কথা বলতে পারতাম, তাহলে আরও ভালো লাগতো।’
পরিবার নিয়ে আসা পলাশ বসাক বলেন, ‘ভারতে আমার মামার বাড়ি। পূজা উপলক্ষে সীমান্তে ছাড় দেওয়া হয় শুনে তাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। মা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েসহ পুরো পরিবার নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু দূর থেকে দেখা ছাড়া ওপারে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। এতে মনের মধ্যে আক্ষেপ ও কষ্ট রয়ে গেছে।’
সার্বিক বিষয়ে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকারিয়া বলেন, ‘শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিলি ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রী পারাপার দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক যাত্রী বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছেন পূজা দেখতে ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে। একই কারণে ভারত থেকেও অনেকে বাংলাদেশে আসছেন। পাশাপাশি পূজাকে কেন্দ্র করে হিলি সীমান্ত এলাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এত দর্শনার্থী আসবেন, তা আমি কখনও কল্পনা করিনি। একসময়ে পাসপোর্ট ছাড়াই দুই পাড়ের স্বজনদের যাতায়াতের কথা শোনা যেতো। এখন পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত কড়াকড়ির কারণে অনেকে সরাসরি যাতায়াত করতে পারছেন না। কিন্তু রক্তের টান ও আবেগ তো থেমে থাকে না। সেই টানেই মূলত দর্শনার্থীরা এখানে আসছেন। কেউ দূর থেকে ওপারে থাকা স্বজনদের দিকে হাত নেড়ে মনের ভাব প্রকাশ করছেন, কেউবা মুঠোফোনে কথা বলছেন। দুর্গাপূজার প্রথম দিন থেকেই এমন দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, যা পূজার শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।’
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন