দিনাজপুরে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ৬ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দূর্গোৎসব সমাপ্ত হয়েছে। এর আগে শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে মঙ্গলবার জেলার প্রতিটি মন্ডপে মহানবমী ও বুধবার বিজয়া দশমী পূজা সম্পন্ন হয়। পূজার শেষ দিনে শহরের মন্ডপগুলো ঢাক-ঢোল, কাঁসর ঘণ্টা, শাঁখের ধ্বনি ও ধূপের ধোঁয়া, আর ভক্তিমন্ত্রে মূখর হয়ে ওঠে। সেই সাথে বর্ণাঢ্য আলোকসজ্জায় উদ্ভাসিত হয়েছিল মন্ডপগুলো।
এই দিনেই দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক (পৃথিবী) ছেড়ে ফিরে যাবেন স্বামীগৃহ কৈলাসে। দেবী দুর্গার বিদায়ে মন্ডপে মন্ডপে ছিল বিষাদের ছায়া। উলুধ্বনি, শঙ্খ, ঘণ্টা আর ঢাকঢোলের বাজনায় ছিল দেবীদুর্গার বিদায়ের সুর। গত ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজা। আর ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গাপূজার। সনাতন ধর্মাবলম্বি সম্প্রদায়ের লোকেরা গত ৬দিন হাসি-আনন্দ আর পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন।
বুধবার (২১ অক্টোবর-২০২৬) বিকেল ৩টার পর বাসুনয়াপট্টি কেন্দ্রীয় মন্দিরসহ শহরের বিভিন্ন পুজামন্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে বিসর্জনের জন্য বিজয়া শোভাযাত্রা করে দিনাজপুর শহরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত পূর্ণভবা নদীর চাউলিয়াপট্টি সাধুরঘাট এলাকায় যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে একে একে নদীতে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। রাত সাড়ে ৭টায় প্রতিমা বিসর্জন দেয়া শেষ হয়।
প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে শহরের নিমতলা মোড়ে ও মডার্ণ মোড়ে পৃথক দুটি বিজয়া মঞ্চ তৈরী করা হয়। নিমতলা মোড়ে দিনাজপুর সদর আসনে সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোঃ মোকাররম হোসেন, পৌর বিএনপির সভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়া, সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মন্ডল বকুল, জেলা বিএনপির সদস্য জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহবায়ক মোস্তফা কামাল মিলন, জেলা বিএনপির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী মঞ্জুর মোর্শেদ সুমন, ক্রীড়া সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মামুনুর রশীদ কচি, জেলা ছাত্রদলের সাবেক আরেক পাহাড় রুবেল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি বিপ্লব কুমার নাগ জয়সহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
আর মডার্ণ মোড়ের মঞ্চ
থেকে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। এ সময় তার সাথে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি হাসানুজ্জামান উজ্জ্বল, সহ-প্রচার সম্পাদক শরীর জাকির হোসেন হিরাসহ বিএনপি'র অন্যান্য নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মোঃ রফিকুল, পুলিশ সুপার মোঃ জিদান আল মুসাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
এদিকে প্রতিমা বিসর্জন উপলক্ষে সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি'র বিপুলসংখ্যক সদস্য ও সাদা পোষাকে বিভিন্ন গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
বিজয়া দশমীর অন্যতম আয়োজন ছিল দেবীবরণ। রীতি অনুযায়ী, সদবা নারীরা স্বামীর মঙ্গল কামনায় দশমীর দিন সিঁদুর, পান ও মিষ্টি নিয়ে দেবীদুর্গাকে সিঁদুর ছোঁয়ান। দেবীর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ানোর পর সেই সিঁদুর প্রথমে সিঁথিতে দিয়ে পরে একে অন্যের সিঁথি ও মুখে ছোয়ান। মুখ রঙিন করে হাসিমুখে দেবীদুর্গাকে বিদায় জানান, যা সিঁদুর খেলা নামে পরিচিত।
পৌরাণিক বর্ণনা অনুযায়ী বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবীদূর্গা তার সন্তান কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীসহ মর্ত্যলোক (পৃথিবী) থেকে কৈলাসে স্বামীর গৃহে ফিরে যাবেন। এর আগে মহালয়ায় তিনি মর্ত্যলোকে (পৃথিবীতে) পিতৃ গৃহে আগমন করেন। আসুরিক শক্তির বিনাশ আর শান্তি কল্যাণ ও সমৃদ্ধি লাভের জন্য হিন্দু সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে দেবী দূর্গার আরাধনা করে আসছেন।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার দেবীদুর্গা মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) এসেছেন গজে (হাতিতে) চড়ে। শান্তি, সংহতি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আসুরিক শক্তির বিনাশকল্পে বিশ্বব্যাপী মঙ্গল বার্তা নিয়ে দেবীদুর্গা এ সময়ে লোকালয়ে আসেন। গজে চড়ে দেবীর আগমনের অর্থ হলো শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা। মনে করা হয়ে থাকে, দেবী যদি গজে চড়ে মর্ত্যলোকে আসেন তাহলে তিনি সঙ্গে করে সুখ, সমৃদ্ধি নিয়ে আসেন। হাতি হচ্ছে জ্ঞান ও সমৃদ্ধির প্রতীক। আর বিজয়া দশমীতে দেবী মর্ত্যলোক ছাড়বেন নৌকায় চড়ে। নৌকায় চড়ে মর্ত্য ছাড়লে ভক্তের মনোবাসনা পূর্ণ হবে। পৃথিবী হয়ে ওঠে শস্য শ্যামলা। কিন্তু সেই সঙ্গে অতি বর্ষণ বা প্লাবনের আশঙ্কাও দেখা দেবে।
অন্যান্য বারের ন্যায় এবারে দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত হিন্দু-মুসলিম নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোর ছুটে আসে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে। এ সময় শহরের মডার্ণ মোড় থেকে চাউলিয়াপট্টি সাধুরঘাট পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশ দর্শণার্থীদের পদচারনায় ভরে উঠে। ওই রাস্তার দু’পাশে অস্থায়ী দোকানীরা বিভিন্ন খাবারের দোকান, বাচ্চাদের খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীর দোকান সাজিয়ে বসেন। প্রতিমা বিসর্জনের দৃশ্য দেখতে আসা দর্শণার্থীরা এসব খাবারসহ অন্যান্য সামগ্রী কিনে নিয়ে বাড়ী ফিরে যায়।
এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিমা বিসর্জনের সময় সার্বিক নিরাপত্তায় পুলিশ, বিজিবি, এসআরবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যবৃন্দ ও দিনাজপুর ফায়ার সার্ভিসের একটি দল প্রতিমা বিসর্জনের সময় সাধুরঘাট এলাকায় অবস্থান করেন।
উল্লেখ্য, দিনাজপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেয়া তথ্যানুযায়ী এবারে জেলার ১৩টি উপজেলায় ১৩১৭টি মন্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দিনাজপুর পৌরসভার ৪৮টিসহ সদর উপজেলায় ১৭৩টি মন্ডপে দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বীরগঞ্জ উপজেলায় ১৬৬টি, কাহারোলে ১০০টি, বিরলে ৯৮টি, বোচাগঞ্জে ৮৬টি, চিরিরবন্দরে ১৫৯টি, খানসামায় ১৪৬টি, ফুলবাড়ীতে ৬২টি, বিরামপুরে ৪৩টি, নবাবগঞ্জে ৭৬টি, হাকিমপুরে ২২টি ঘোড়াঘাটে ৩৬টি ও পার্বতীপুর উপজেলায় ১৫৪টি মন্ডপে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।
বুধবার ২১ অক্টোবর জেলার ১৩টি উপজেলায় বেশিরভাগ মন্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয় ও কয়েকটি মন্ডপের প্রতিমা আগামী ৩দিনে বিসর্জন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ কর্তৃপক্ষ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন