সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে পাওয়া ডিজিটাল আলামত ঘিরে মামলাটিতে নতুন মোড় তৈরি হয়েছে। এসব আলামতের মধ্যে রয়েছে জিও-লোকেশন, খুদে বার্তা ও কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি।
পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের হাতে পৌঁছায়। কিছু নথি যাচাই করে প্রসিকিউশন প্রাথমিকভাবে দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পায় বলে জানানো হয়েছে। প্রসিকিউশনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্সও মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বিষয়টি আদালতে তুলে ধরেছে।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে প্রসিকিউশন। প্রতিবেদনে ডিএনএ পরীক্ষা, সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তদন্তসংক্রান্ত তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে ভাড়া বাসায় খুন হন সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানার এক কর্মকর্তা মামলাটির তদন্ত করেন। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি তদন্তের দায়িত্ব পান গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলম। দুই মাস পর হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব)। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সংস্থাটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে ২০১২ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ জনস্বার্থে রিট করে। ওই আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি জারি করা রুলে সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
নতুন তথ্যের বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুদকের অভিযানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করা হয়। এসবের মধ্যে জিও-লোকেশন, খুদে বার্তা ও সিডিআরের মুদ্রিত কপি ছিল। এ বিষয়ে জিয়াউল আহসানের এক সহকারী সেনাসদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক তদন্তে জিয়াউল আহসান ও একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন।
পরে টাস্কফোর্সের সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর ও প্রসিকিউটরের আলোচনায় তারা জানান, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই চলছে। প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্য পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানানো হয়।
এ জন্য গত ১৩ অক্টোবর মামলার ডিজিটাল আলামত ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো সেসব তথ্য পাওয়া যায়নি।
টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদসহ তদন্তের বাকি কাজ শেষ করতে আরও সময় প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ৩০০টি সিডিতে অসংখ্য তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও এবং বিভিন্ন অপরাধসংক্রান্ত উপাত্ত থাকতে পারে। সেগুলো পর্যালোচনা করা হবে। পর্যালোচনা শেষে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্যপ্রমাণ তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হলে তিনি সেগুলোর ভিত্তিতে পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন