সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশ্বে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মের আধিপত্য দীর্ঘদিনের। সেই আধিপত্যের ভীড়ে দেশীয় প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও নিজস্ব ডিজিটাল পরিসর তৈরির স্বপ্ন নিয়ে রংপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছে ‘ফ্রিডার'।
নগরীর স্টাফ কোয়ার্টার সংলগ্ন গঙ্গাচড়া সড়কের ধারে ভাড়া করা একটি ভবনে ফ্রিডারের প্রধান কার্যালয়ে এই প্লাটফর্মের কাজ চলছে। যেখানে ১৫ শিক্ষিত বেকারের হয়েছে কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা এই প্ল্যাটফর্মটি ইতোমধ্যে ১০ লাখ নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর মাইলফলক অর্জন করেছে।
‘স্বাধীনতা উপভোগ করুন ফ্রিডারের মধ্যে’ এই স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্ল্যাটফর্মটি উদ্যোক্তাদের কাছে শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং বাংলাদেশিদের নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার একটি নিজস্ব ডিজিটাল ঠিকানা। তাদের লক্ষ্য, দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবহারকারীরা সহজে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ফ্রিডারের উদ্যোক্তা মো. আখতারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, দেশ-বিদেশের মানুষের মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে ইতোমধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীদের মধ্যে পরিচিতি ও আগ্রহ বাড়ছে। বর্তমানে ফ্রিডারে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। প্রতিদিন নতুন করে প্রায় এক থেকে পাঁচ হাজার ব্যবহারকারী নিবন্ধন করছেন। এই অগ্রগতি ফ্রিডারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করছে।
তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সার্ভারের সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
আখতারুজ্জামানের মতে, একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সার্ভার সক্ষমতা এবং ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আখতারুজ্জামান বলেন,
ফ্রিডারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলো ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, অশ্লীলতা পরিহার এবং দেশের সম্মান ও মূল্যবোধ বজায় রেখে একটি ইতিবাচক ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি, মনিটাইজেশনের মাধ্যমে আয় করা ব্যবহারকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশ যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে প্ল্যাটফর্মটি।
ফ্রিডারের 'হেড অব সাপোর্ট' রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, এটি শুধু রংপুরের উদ্যোগ নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের জন্যও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলতে পারে। তবে ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের অর্জিত আস্থা। ফ্রিডারকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম জানান, বর্তমানে তাদের অন্যতম লক্ষ্য হলো নতুন ও পুরোনো ব্যবহারকারীদের জন্য সেবার মান আরও উন্নত করা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো। ব্যবহারকারীদের আগ্রহকে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত করতে পরিকল্পিত প্রচারণা ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন,
ফ্রিডারে মাত্র ১৫০ টাকায় প্রোফাইল ভেরিফিকেশন এবং ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশনের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি নামমাত্র খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপন দেয়ার সুযোগ এবং এক হাজার ফলোয়ার হলেই মনিটাইজেশনের সুযোগ রয়েছে। এসব সুবিধার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারী, কনটেন্ট নির্মাতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি অনলাইনে আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারেন।
পরিকল্পিত উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা পেলে দেশীয় এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে বাদশা আলম আরও বলেন, ফ্রিডারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা আরও সহজ করা, নিরাপত্তা জোরদার এবং নতুন নতুন সুবিধা যুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মটির অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল করতে পারে।
ফ্রিডার ব্যবহারকারীদের একজন জুয়েল আহমেদ বলেন, বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। দেশের মানুষের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড, বিজ্ঞাপন ও অনলাইন ব্যবসার একটি অংশ দেশীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হলে তা দেশের প্রযুক্তি খাত ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত ফ্রিডার ব্যবহারকারী জনি রহমান বলেন, রংপুর থেকে শুরু হওয়া ফ্রিডার এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, এটি দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। ১০ লাখ নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর মাইলফলক অর্জন প্ল্যাটফর্মটির অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন ব্যবহারকারীদের আস্থা ধরে রাখা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ফ্রিডার কতটা এগিয়ে যেতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন