একদিকে বাবার বেকারত্ব, অন্যদিকে সংসারে নিত্যদিনের অভাব-অনটন। পড়াশোনার খরচ জোগাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে, সেখানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করাও ছিল কঠিন। তবে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতাকে বাধা হতে দেয়নি যমজ দুই বোন। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় দুজনই পেয়েছে জিপিএ-৫। তাদের এমন সাফল্যে আনন্দিত পরিবার ও এলাকাবাসী।
সফল দুই বোন হল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জী গ্রামের মনির হোসেন সরদার রিজু ও নাছিমা বেগমের যমজ মেয়ে রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। তারা দুজনই রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী।
পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। বাবা মনির হোসেন বেকার। তিন মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে মা-বাবাকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই ছিল পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অভাবের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। তবু মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি মা-বাবা।
এই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন কলেজের কয়েকজন শিক্ষক। শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল তাদের পড়াশোনায় সহযোগিতা করেছেন। তাদের একজন দুই বোনের একজনকে বিনা পারিশ্রমিকে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। কলেজ কর্তৃপক্ষও ভর্তি ও ফরম পূরণে নামমাত্র অর্থ নিয়েছে। পাশাপাশি উপবৃত্তির সহায়তাও পেয়েছে তারা। এসব সহযোগিতা তাদের স্বপ্নপূরণের পথে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।
মা নাছিমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী বেকার। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে। মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাতে অনেক কষ্ট হয়েছে। শিক্ষকেরা বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, কলেজের অধ্যক্ষও ভর্তি ও ফরম পূরণে অনেক সহযোগিতা করেছেন। উপবৃত্তি পেয়েছে। সবার সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েরা এত ভালো ফল করতে পারত না।’
রহিমা ও রাবেয়া জানায়, পড়াশোনার পেছনে দিনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছে তারা। যাতায়াত ও খাওয়া-দাওয়ার সময় বাদে বাকি সময় পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে। ভালো ফল করে বাবার মুখে হাসি ফোটানো এবং পরিবারের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করার ইচ্ছা ছিল তাদের। এখন ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে চায় তারা।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, দুই বোনের এমন ফলাফলে তারা আনন্দিত ও গর্বিত। রাজারহাট উপজেলার ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী এই দুই যমজ বোনই। তাদের সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
অভাবের সংসারে যেখানে প্রতিটি দিনই ছিল টিকে থাকার লড়াই, সেখানে দুই বোনের জোড়া জিপিএ-৫ পরিবারে নিয়ে এসেছে স্বস্তি ও আশার আলো। তাদের এই অর্জন শুধু ভালো ফলের গল্প নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন