জন্ম থেকেই দুটি হাত অচল। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা কোনোদিনই তার স্বপ্নকে অচল করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পা-ই হয়ে উঠেছে তার হাত, তার শক্তি, তার এগিয়ে চলার একমাত্র ভরসা। দুই পা দিয়েই লিখছেন, ছবি আঁকছেন, কম্পিউটার ও মোবাইল চালাচ্ছেন, সুরালা কণ্ঠে গান গাইছেন কলি। পা দিয়েই এইচএসসি পরীক্ষার অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে পাস করেছেন রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার তিস্তাপাড়ের গদাই গ্রামের অদম্য মেয়ে কলি রানী। তিনি মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৩.৫০ পেয়েছেন।
জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিবন্ধকতাকে হার মানিয়ে এগিয়ে চলা কলির বিশ্বাস, মানুষের সীমাবদ্ধতা শরীরে নয়, মনোবলে। তিনি ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা নিয়েই এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ফলাফলে খুশি হয়েছেন। এর আগে এসএসসিতেও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তার স্বপ্ন—বিসিএস ক্যাডার হয়ে প্রশাসনে যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করা।
তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান কলি। কৃষক মনোরঞ্জন রায়ের মৃত্যুর পর ছয় ভাই-বোনের সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। সংসারের সবচেয়ে ছোট সন্তান কলিকে নিয়ে মা রুপালী রানীর সংগ্রাম তখন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, অন্যদিকে আর্থিক সংকট—দুইয়ের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছেন কলি।
পরিবারের সামান্য কৃষিজমিই তাদের একমাত্র সম্বল। তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে সেই জমিরও বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। তারপরও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেননি কলি।
শুধু লেখাপড়াতেই নয়, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। ভাওয়াইয়া ও দেশাত্মবোধক গান গেয়ে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ডজনখানেক পুরস্কার জিতেছেন। পা দিয়ে ছবি এঁকেও পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা। কম্পিউটার ও স্মার্টফোন ব্যবহারে তিনি দক্ষ। অদম্য সাহস ও আত্মবিশ্বাসের কারণে স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত 'হার না মানা তরুণী' হিসেবে।
কলির মা রুপালী রানী বলেন, জন্ম থেকেই মেয়ের দুটি হাত বিকল। তাই ছোটবেলা থেকেই তাকে পা দিয়েই সব কাজ শেখানো হয়েছে। অবিশ্বাস্য অধ্যবসায়ের মাধ্যমে কলি নিজের দুই পাকে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলেছে।
তিনি বলেন, "আমার মেয়েকে কখনো নিজের ভাগ্য নিয়ে আফসোস করতে দেখিনি। পা দিয়ে সে লেখাপড়া করে, খাওয়া-দাওয়া করে, গোসল করে, চুল আঁচড়ায়, মোবাইল ও কম্পিউটার চালায়। শুধু নিজের পোশাক নিজে পরতে পারে না। ওই কাজটুকু আমি করে দিই।"
মেয়ের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। "ওর খুব বড় স্বপ্ন—বিসিএস করে মানুষের জন্য কাজ করবে। কিন্তু আমাদের সেই সামর্থ্য নেই। ওর বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আরও ভালোভাবে পাশে দাঁড়াতে পারতেন। কৃষিকাজের সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তারপরও মেয়ের স্বপ্ন পূরণে যতটা পারি চেষ্টা করে যাচ্ছি।"
কলির বড় ভাই মন্টু রায় বলেন, ছোটবেলায় ডান পা দিয়ে ধীরে ধীরে লেখা শেখা শুরু করেছিল তার বোন। দীর্ঘ অনুশীলনের মাধ্যমে এখন সে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই দ্রুত লিখতে পারে।
তিনি বলেন, "তিস্তার ভাঙনে আমাদের অনেক জমি নদীতে চলে গেছে। এখন যা আছে, তা চাষ করেই কোনোভাবে সংসার চলছে। তারপরও বোনের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সেই চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাব।"
নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কলি রানী বলেন, "আমার মা সবসময় আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। ভাই, পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, সহপাঠী—সবাই আমাকে সাহস দেন। তাদের ভালোবাসাই আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে শেখায়।"
তিনি আরও বলেন, "আমার দুটি হাত নেই বলে কোনোদিন আফসোস করিনি। আমার দুই পা-ই আমার হাত, আমার শক্তি। এই পায়ের ওপর ভর করেই আমি সব বাধা অতিক্রম করতে চাই। আমি স্বপ্ন দেখি, আর সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থামব না।" ‘আমি জিপিএ-৩.৫০ পেয়ে পাস করেছি। আমি খুব খুশি। আগামিতে আরো ভালো করার ব্রত নিবো,’ তিনি বলেন।
কাউনিয়া মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কলি রানীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। সে কাউনিয়া মহিলা কলেজে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৩.৫০ পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "কলি শুধু লেখাপড়াতেই নয়, সংগীতচর্চা, চিত্রাঙ্কন ও কম্পিউটার শিক্ষার মাধ্যমেও নিজেকে দক্ষ করে তুলেছে। তার জীবন অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।"
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন