জীবনের মায়া কাটিয়ে প্রিয়জনেরা চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। কিন্তু তাঁদের স্মৃতি আজও আগলে রেখেছেন স্বজনেরা। কেউ এসেছেন হাতে গোলাপ, কেউ জবা, কামিনী কিংবা সন্ধ্যামালতি ফুল নিয়ে। আবার কারও হাতে মোমবাতি ও মঙ্গলপ্রদীপ। সমাধির ওপর যত্ন করে বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে ফুল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই একে একে জ্বলে উঠছে প্রদীপের আলো। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠছে সারি সারি সমাধি। বিষণ্ন চোখে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন বাবা-মায়ের সমাধির পাশে, কেউ স্মরণ করছেন প্রয়াত স্বামী, স্ত্রী, ভাইবোন কিংবা অন্য স্বজনকে। প্রার্থনা আর ভালোবাসার এই নীরব আয়োজনে জীবিত ও মৃতের মধ্যে যেন তৈরি হয়েছে এক আত্মিক বন্ধন।
সোমবার (২ নভেম্বর) দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ৩ নম্বর খানপুর ইউনিয়নের ধানজুড়ি গ্রামের শালবনঘেঁষা খ্রিষ্টান সমাধিস্থলে দেখা যায় এমন দৃশ্য। খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের মৃত স্বজনদের স্মরণে বিশেষ ধর্মীয় পর্ব উপলক্ষে সকাল থেকেই সমাধিস্থলে শুরু হয় নানা আয়োজন। কেউ সমাধি পরিষ্কার করছেন, কেউ ফুল দিয়ে সাজাচ্ছেন, আবার কেউ প্রার্থনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই মোমবাতি ও মঙ্গলপ্রদীপের আলোয় অন্য রকম এক আবহ তৈরি হয় পুরো সমাধিস্থলে।
স্থানীয় খ্রিষ্টান ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের কাছে ধানজুড়ির এই সমাধিস্থল কেবল মৃতদের শেষ ঠিকানা নয়, এটি তাঁদের পূর্বপুরুষ, পারিবারিক ইতিহাস ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় ঐতিহ্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। ধানজুড়ি, বড় ন্যাটাশন, ছোট ন্যাটাশন, বটতলী, ধাকন্দ, দীঘলচাঁদ, সোনাজুড়ি ও জঙ্গলপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে এই সমাধিস্থলের রয়েছে গভীর সম্পর্ক।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সমাধিস্থলটিতে রয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ১০০ বছরের পুরোনো পাঁচ শতাধিক সমাধি। এর পূর্ব পাশে বিশেষভাবে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ৪০টি সমাধি। ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যেসব রোগীর মৃত্যু হয়েছিল এবং যাঁদের মরদেহ পরিবারের সদস্যরা গ্রহণ করেননি, তাঁদেরও এখানে সমাহিত করা হয়েছিল। ফলে এই সমাধিস্থল শুধু স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগের জায়গা নয়, মানবিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নভেম্বর মাস মৃত ব্যক্তিদের স্মরণ ও তাঁদের আত্মার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনার বিশেষ সময়। তাঁদের কাছে পুরো নভেম্বর মাসই ‘মৃত ব্যক্তিদের মাস’ হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে ২ নভেম্বর পালিত হয় মৃত ব্যক্তিদের স্মরণে বিশেষ পর্ব। এদিন স্বজনেরা মৃত ব্যক্তিদের সমাধিতে ফুল দেন, মোমবাতি ও মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালান এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে পরিবারের জীবিত সদস্যদের মঙ্গল, শান্তি ও কল্যাণও কামনা করেন। নভেম্বরজুড়েই চলে মৃত স্বজনদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে এ অঞ্চলে মৃত ব্যক্তিদের স্মরণে এ পর্ব পালনের ঐতিহ্য চলে আসছে। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া সেই রীতি আজও ধরে রেখেছেন পরবর্তী প্রজন্ম। সময়ের সঙ্গে আয়োজনের ধরনে কিছু পরিবর্তন এলেও প্রিয়জনদের সমাধিতে গিয়ে ফুল দেওয়া, মোমবাতি জ্বালানো এবং প্রার্থনার মাধ্যমে তাঁদের স্মরণ করার রীতি হারিয়ে যায়নি।
ধানজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পারগানা (প্রধান) ক্যারোবিন হেমব্রোমের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানকার খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর ২ নভেম্বর মৃত স্বজনদের স্মরণে বিশেষ পর্ব পালন করেন। এদিন তাঁরা সমাধিতে ফুল ও মোমবাতি দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এবং প্রয়াতদের আত্মার কল্যাণ কামনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন।
ধানজুড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও খানপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ফ্লাবিয়াস হেমব্রোমের দেওয়া পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, একসময় এখানে ১৪টি গ্রামের মানুষ তাঁদের মৃত স্বজনদের সমাহিত করতেন। পরে সমাধিস্থলে জায়গার সংকট দেখা দিলে সাতটি গ্রামের মানুষ নিজ নিজ গ্রামে স্বজনদের সমাহিত করার ব্যবস্থা করেন। তাঁর নিজের বাবা-মায়ের পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়স্বজনের সমাধিও রয়েছে এই স্থানে। তাঁদের স্মরণে তিনি মিশনের গির্জা ও সমাধিস্থলে বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নিতেন।
ধানজুড়ি মিশনের পাল-পুরোহিত ফাদার মানুয়েল হেমব্রোমের দেওয়া পূর্ববর্তী ব্যাখ্যায়, মৃত ব্যক্তিদের আত্মার মঙ্গল কামনায় এ পর্ব মূলত খ্রিষ্টধর্মের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মানুষ পালন করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ফাদার অধীয় নামের একজন সন্ন্যাসী ২ নভেম্বর মৃত ব্যক্তিদের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনার মাধ্যমে এ পর্বের প্রচলন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এটি বিশ্বজুড়ে পালিত হতে থাকে।
এ ধর্মীয় পর্বকে ঘিরে ধানজুড়িতে শুধু সমাধিতে ফুল দেওয়া কিংবা মোমবাতি প্রজ্বালনেই আয়োজন সীমাবদ্ধ থাকে না। খ্রিষ্টযাগ, মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা, সমাধিস্থল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং এলাকার গরিব ও দুস্থ মানুষকে খাবার দেওয়ার মতো মানবিক কার্যক্রমও এর অংশ। সকাল থেকে শুরু হওয়া ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ও বিকেলের আয়োজন শেষে সন্ধ্যায় সমাধির পাশে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
দিনের আলো নিভে গেলে সমাধির ওপর জ্বলতে থাকা অসংখ্য প্রদীপ যেন একেকটি স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে। কারও কাছে সেই আলো প্রয়াত মা-বাবার স্মৃতি, কারও কাছে হারিয়ে যাওয়া জীবনসঙ্গী কিংবা প্রিয় স্বজনের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। সমাধির পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর প্রার্থনায় ফুটে ওঠে জীবনের এক গভীর সত্য—মানুষ পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও স্বজনদের হৃদয় থেকে হারিয়ে যান না। ধানজুড়ির এই আয়োজন তাই শুধু একটি ধর্মীয় পর্ব নয়, মৃত্যুর পরও প্রিয়জনদের ঘিরে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য ঐতিহ্য।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন