রংপুর অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। কর্মসংস্থানের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য কথাটা শুনতে যতটা ভাবসাবময় মনে হয়, বাস্তব চিত্রটা আসলে ততটাই করুণ। এখানকার ব্যবসা-বাণিজ্য মূলত দোকানকেন্দ্রিক।
রংপুর নগরীসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের দোকান, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কোচিং সেন্টার, বিভিন্ন ইন্সটিটিউট ও স্কুল মাদ্রাসা। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানও চালু হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পুঁজি আসে সাধারণত জমি বিক্রির টাকা কিংবা বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সারা জীবনের জমানো সঞ্চয় থেকে।
একসময় যে জমির প্রতি শতাংশের দাম ছিল পঞ্চাশ হাজার টাকা, সময়ের ব্যবধানে সেই জমির দাম বেড়ে হয়েছে দুই থেকে দশ লাখ টাকা। বাড়ির ছেলে বেকার বসে আছে কিংবা স্বল্প বেতনে চাকরি করছে-নো চিন্তা! জমি বিক্রি করো, দোকান দাও; ক্লিনিক কিংবা প্যাথলজি সেন্টারে বিনিয়োগ করো। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হয়ে যাও, যার পদবিটাও আবার বেশ চটকদার-'ডিরেক্টর'!
রংপুরে আরেকটি প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়, তা হচ্ছে অনুকরণ। এখানে অনেক ক্ষেত্রেই মেধা কিংবা বুদ্ধি খাটিয়ে নতুন কিছু করার চেয়ে অন্যের সফল উদ্যোগ অনুকরণ করার প্রবণতা বেশি। যে ধরনের দোকান, রেস্টুরেন্ট, ক্লিনিক কিংবা প্যাথলজি সেন্টার বা অন্যান্য কিছু চলছে, সেগুলোর আদলে বুঝে না বুঝেই একের পর এক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। নেই কোনো যথাযথ বিশ্লেষণ। প্রতিষ্ঠানটি কেমন চলবে, সম্ভাব্য ক্রেতা বা গ্রাহক কারা, বাজারের চাহিদা কতটুকু, ব্যবসাটি কতটা টেকসই হবে কিংবা বিনিয়োগ করা পুঁজির নিরাপত্তা কতটুকু, এসব বিষয় নিয়ে প্রয়োজনীয় ভাবনাচিন্তা ছাড়াই অনেকে প্রতিষ্ঠান খুলে বসছেন।
তবে একেবারেই যে কেউ কিছু ভাবছেন না, তা নয়। অনেকেই অনিশ্চয়তা জেনেও এসব উদ্যোগ নিচ্ছেন। কারণ, কিছু একটা তো করে খেতে হবে, জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। বেকারত্বের বাস্তবতা মানুষকে অনেক সময় ঝুঁকি নিতে বাধ্য করে।
এদিকে হু হু করে বেড়েছে দোকান, ক্লিনিক, প্যাথলজি সেন্টার কিংবা স্কুলের উপযোগী ভবন ও বাসাবাড়ির ভাড়া। প্রতিষ্ঠান চলুক আর না চলুক, তাতে ভবনমালিকের খুব একটা যায় আসে না। উচ্চ ভাড়াতেও মানুষ প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিচ্ছে। কারণ, কিছু একটা করে তো চলতে হবে!
ফলে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ব্যবসায় নেমে অনেকেই শেষ পর্যন্ত নিজেদের সঞ্চিত পুঁজি হারিয়ে আরও অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। অথচ রংপুর অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে কলকারখানা তথা শিল্পায়ন ঘটলে কর্মসংস্থানের চিত্রটাই বদলে যেতে পারত। শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে শুধু সেখানেই সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, প্রতিটি শিল্পকারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে পরিবহণ, খাদ্য সরবরাহ, আবাসন, কাঁচামাল ও বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহসহ নানা ধরনের সহযোগী ব্যবসা ও সেবামূলক উদ্যোগ। সৃষ্টি হবে ঠিকাদারি ব্যবসার নতুন নতুন ক্ষেত্র ও সম্ভাবনার বহুমুখী উইং।
অর্থাৎ শিল্পায়ন শুধু চাকরির সুযোগ তৈরি করে না, একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশও তৈরি করে। রংপুর অঞ্চলের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য তাই দোকানকেন্দ্রিক ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে পরিকল্পিত শিল্পায়নের বিকল্প নেই।
লেখক-রানা মাসুদ
সাহিত্যকর্মী,
ডিরেক্টর, রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন