দূর থেকে দেখলে মনে হবে লিচু বাগান। কাছে গেলেই মিলবে চমক। গাছে গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় বাদামি রঙের ছোট ছোট ফল। এসব হচ্ছে ভিনদেশি ফল কাঠলিচু বা লটকন। এ লটকন এখন চাষ হচ্ছে দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায়। এ লটকন চাষে বাজিমাত করেছেন মাও. মনিরম্নজ্জামান রিফাত (৪০)। তিনি একজন সফল পোল্ট্রি খামারি হিসাবে এলাকায় পরিচিত। তার খামারের নাম 'মেসার্স প্রবাস বন্ধু পোল্ট্রি অ্যান্ড চকিস'। তার বাগানের লটকন এখন দেশের বাজারে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তার বাগানের লটকন দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাট-বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
মাও. মনিরম্নজ্জামান রিফাত উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের জোতকৃষ্টপুর গ্রামের মনির উদ্দিনের ছেলে। তার কাঠলিচু বা লটকন বাগানে গিয়ে আলাপকালে তিনি লটকন চাষে তার ব্যাপক সাফল্যের কথা নিশ্চিত করেন। তিনি জোতকৃষ্টপুর গ্রামে তার নিজের পোল্ট্রি ফার্ম এবং লটকন ফলের বাগান করেছেন। তিনি দুই একর জমিতে দুই প্রজাতির শতাধিক গাছের লটকন বাগান গড়ে তুলেছেন। চলতি বছর তিনি অন্ত্মত সাড়ে ১০ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন। এসবের পাশাপাশি এবারই প্রথম তিনি তার বাগানে উৎপাদিত এক হাজার লটকন গাছের চারা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছেন।
সরজমিন লটকন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় দুই একর জমির চারপাশে শতাধিক লটকন ফলের গাছ। বাগানে প্রতিটি গাছেই লটকন ধরেছে। এখানে ভিয়েতনামের দুইটি উন্নত জাত পিংকন এবং পিংপং চাষ করা হয়েছে। দেশে নতুন ও উচ্চ মূল্যের ফল হিসেবে এর চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে শুরম্ন করেছে। উদ্যোক্তা মনিরম্নজ্জামান রিফাত জানান, দীর্ঘদিন সে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করেছেন। সেখানেই প্রথম এই লটকন ফলের সাথে পরিচয় হয়। আবুধাবিতে প্রায়ই ফলের ঝুড়িতে কাঠলিচু বা লটকন ফল দেখতাম। স্থানীয়রা খুবই আগ্রহ সহকারে এই ফল খেতেন। আমি সেখানে থাকাকালীন সময়ে প্রায়শই এ ফল খেয়েছি। তখন থেকেই এ ফল চাষের প্রতি আমার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দেশে ফিরে গত ২০২২ সালের জুন মাসে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেলডাঙ্গি গ্রামের মো. কামরম্নজ্জামান নামের একজনের নার্সারি থেকে ৫০টি উন্নত জাতের লটকন ফলের চারা সাড়ে ৩ হাজার টাকায় ক্রয় করে নিয়ে এসে পরে ওই একই নার্সারি থেকে আরও ৭৫টি চারা সংগ্রহ করেন। নিজস্ব দুই একর জমিতে পোল্ট্রি খামারের চারপাশে এসব লটকনের গাছ লাগিয়েছি। মাত্র ৪ থেকে ৫ বছরের পরিচর্যায় এখন প্রতিটি গাছে অধিক পরিমাণ ফল দিচ্ছে। গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছি। এবার যে পরিমাণ ফল এসেছে, তাতে এখন পর্যন্ত্ম প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছি। বাগান দেখে অনেক কৃষক ও আশপাশের জেলার উদ্যোক্তা তরম্নণ ও যুবকরা লটকনের বাগান করতে আগ্রহী হচ্ছেন। অনেকেই তার কাছ থেকে চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আকারভেদে প্রতি একশ লটকন ফলের চারা ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত্ম বিক্রি করছি। আমার কাছে বর্তমানে প্রায় এক হাজার চারা মজুত রয়েছে। এই চারা বিক্রি করে কমপক্ষে এক লাখ টাকা আয় করতে পারব। লটকনের চারার চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছি না।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা বলেন, বিদেশ ফেরত একজন উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করেছেন। লটকন চাষের ৪ থেকে ৫ বছর পর এবার তার বাগানের লটকন গাছে অধিক পরিমাণ ফল এসেছে। লটকন, লিচু ও রাম্বুটান একই উদ্ভিদ জাতের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। এখানে ভিয়েতনামি পিংপং জাতের লটকন চাষ করা হয়েছে। তাতে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ তুলনামূলক খুবই কম। কম কীটনাশক ব্যবহার করেই নিরাপদে এই ফল উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষিবিভাগ থেকে নিয়মিত উদ্যোক্তাকে তার লটকন চাষে পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে।
দিনাজপুর হর্টিকালচার বিভাগের উপপরিচালক মো. এজামুল হক বলেন, উপযুক্ত পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে এই ফলের বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ কৃষকদের জন্য লাভজনক অবস্থার পথ খুলে দিতে পারে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন