চাষ শুরুর আগে বাবার আস্থা পাননি, তাই নিজের পৈতৃক জমি নয়—২৪ হাজার টাকা দিয়ে ৩৩ শতক জমি ইজারা নিয়েছিলেন রকিবুল হক। সেই জমিতেই এখন দুলছে ভিয়েতনাম জাতের ব্ল্যাক রাইসের কালো শীষ। ধান কাটার আগেই খেত দেখতে ভিড় করছেন মানুষ, আর বীজের জন্য আগাম যোগাযোগ করছেন কৃষকরা।
প্রথমবার এই ধান চাষে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন তিনি। কাঙ্ক্ষিত ফলন ও বাজারদর পেলে বিক্রি হতে পারে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার ধান।
রকিবুল হক বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর ইউনিয়নের দিঘড়ী গ্রামের আমিনুল হকের ছেলে। নিজের এলাকায় ২৪ হাজার টাকায় ৩৩ শতক জমি ইজারা নিয়ে গত ৯ জুলাই তিনি ব্ল্যাক রাইসের চারা রোপণ করেন। আগামী ১০ থেকে ১২ অক্টোবর ধান কাটার কথা রয়েছে।
ব্ল্যাক রাইস চাষের ভাবনাটা হঠাৎ করেই আসে রকিবুলের। অনলাইনে ৫০০ টাকা দিয়ে এক কেজি ব্ল্যাক রাইসের চাল কিনে ভাত খাওয়ার পর এই ধান চাষের আগ্রহ তৈরি হয় তার। পরে অনলাইনে ১ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে দুই কেজি বীজ সংগ্রহ করে বীজতলায় বপন করেন। নিজের পৈতৃক জমিতে চাষ করতে চেয়েছিলেন রকিবুল। কিন্তু ছেলের নতুন উদ্যোগে শুরুতে ভরসা পাননি বাবা আমিনুল হক। তাই জমি দিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে জমি ইজারা নিয়ে চাষ শুরু করেন রকিবুল।
রকিবুল হক বলেন, ব্ল্যাক রাইস সাধারণ ধানের মতোই চাষ হয়। এ ধান চাষে অতিরিক্ত সার বা পানির প্রয়োজন হয় না। আলাদা কোনো পরিচর্যারও প্রয়োজন নেই। প্রথমবার চাষ করে উৎপাদন কেমন হয়, পরিবারের জন্য কেমন হবে এবং এর ক্রেতা কারা—এসব জানতেই চাষ শুরু করেছি। সফল হলে আগামীতে ব্যাপকভাবে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার দাবি, ৩৩ শতক জমি থেকে ১৮ থেকে ২০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছি। বাজারে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দরে ব্ল্যাক রাইস বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সেই হিসাবে কাঙ্ক্ষিত ফলন ও দাম পাওয়া গেলে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকার ধান বিক্রি করতে পারবেন। তবে এই হিসাবের মধ্যে উৎপাদনের অন্যান্য খরচ ধরা হয়নি। এখনো খেতেই আছে রকিবুলের কালো ধান। কিন্তু ধান দেখতে আসা মানুষের কৌতূহল যেন আগেই সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। কালো ধানের চাষ ও এর নানা গুণের কথা শুনে অনেক কৃষক তার কাছ থেকে বীজ নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ অনলাইনে বীজ সংগ্রহের জন্যও তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ধানের শীষ সাধারণ ধানের তুলনায় বড় বলে জানান রকিবুল। ধান যেমন কালো, চালও তেমন কালো। এ চালের ভাতও কালো রঙের হয়। পরিবারের জন্য খাওয়া এবং উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি বাজারে এর চাহিদা কেমন, তা বোঝাও তার এই পরীক্ষামূলক চাষের উদ্দেশ্য।
রকিবুল বলেন, ব্ল্যাক রাইসের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখে এর বিভিন্ন গুণ সম্পর্কে জেনেছি। সেখানে ডায়াবেটিস, স্নায়ুরোগ ও বার্ধক্য প্রতিরোধে কালো চালের উপকারিতার কথা বলা হয়েছে। এতে ভিটামিন, ফাইবার ও মিনারেল রয়েছে বলেও জেনেছি। এসব কারণেও এই ধান চাষে আগ্রহী হয়েছি। তার খেত দেখে ইতোমধ্যে কৃষক শম্ভু রায়, জুয়েল ও আকাশসহ অনেকে বীজ নেওয়ার জন্য আগাম বলে রেখেছেন।
স্থানীয় কৃষকরা বলেন, ধানগুলো দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছে। আমরাও আগামীতে এই ধান চাষ করতে চাই। তাই রকিবুলের কাছে বীজের কথা বলে রেখেছি। তার অভিজ্ঞতাও আমাদের কাজে লাগবে। শুরুতে ছেলের সিদ্ধান্তকে সহজভাবে নিতে পারেননি আমিনুল হক। ইন্টারনেটে কিছু দেখে ছেলে নতুন ধরনের ধান চাষে আগ্রহী হওয়ায় তিনি এটিকে পাগলামি মনে করেছিলেন। তাই পৈতৃক জমিতে চাষের অনুমতি দেননি।
আমিনুল হক বলেন,প্রথমে ভরসা পাইনি। মনে করেছিলাম, ছেলে ইন্টারনেট দেখে পাগলামি করছে। তাই চাইলেও তাকে জমি দিইনি। কিন্তু সে জেদ করে জমি ইজারা নিয়ে ব্ল্যাক রাইস চাষ করেছে। এখন দেখে মনে হচ্ছে, ভালোই করেছে। আগামীতে তাকে যত জমি দরকার দেব। সে যত খুশি ব্ল্যাক রাইস চাষ করবে।’
বোচাগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন কুমার সাহা বলেন, ব্ল্যাক রাইস বা কালো চাল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যান্থোসায়ানিন, ফাইবার ও আয়রনসমৃদ্ধ। পুষ্টিগুণের আধিক্যের কারণে বিশ্বজুড়ে একে সুপারফুড বলা হয়। রোগ প্রতিরোধী এই ধানের চাল উৎপাদন করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বোচাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মারুফ হাসান বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্ল্যাক রাইস চাষ হচ্ছে। বোচাগঞ্জে এবারই প্রথম এই ধানের চাষ হয়েছে। সঠিকভাবে উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারলে এটি লাভজনক হতে পারে। কারণ শৌখিন ক্রেতাদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। চাইনিজ রেস্তোরাঁগুলোতেও এই চালের কদর আছে। আমরা রকিবুলের সফলতা দেখার অপেক্ষায় রয়েছি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন