পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার আউলিয়ার ঘাটে ভয়াল নৌ-ট্র্যাজেডির চার বছর পূর্তি আজ। ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ প্রাণ হারান ৭২ জন। চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই শোকের ক্ষত শুকায়নি স্বজনদের। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একজন।
শুধু স্বজন হারানোর বেদনা নয়, চার বছরেও কাটেনি আউলিয়ার ঘাট দিয়ে নদী পারাপারের দুর্ভোগ। ট্র্যাজেডির দুই বছর পর করতোয়া নদীর ওপর পৃথক স্থানে দুটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পার হচ্ছেন ৫ ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে তা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হোক।
যেভাবে ঘটেছিল ভয়াল সেই দুর্ঘটনা
২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহালয়া উপলক্ষে বোদা উপজেলার আউলিয়ার ঘাট দিয়ে শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি নৌকা করতোয়া নদী পার হচ্ছিল। নৌকাটি নদীর মাঝপথে পৌঁছালে পানির স্রোতে দুলতে শুরু করে।
নদীর পাড়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিস্থিতি দেখে মাইকে মাঝিকে সতর্ক করে নৌকা ঘুরিয়ে আনতে বলেন। কিন্তু নৌকা ঘোরানোর সময়ই ঘটে বিপত্তি। মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি ডুবে যায়। পানিতে তলিয়ে যান নৌকায় থাকা যাত্রীরা।
খবর পেয়ে নদীর তীরে থাকা অন্য নৌকার মাঝি ও স্থানীয়রা উদ্ধারে ছুটে যান। অনেককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৭২ জনের প্রাণহানি ঘটে।
পরবর্তী সময়ে ৭১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও আজও সন্ধান মেলেনি বোদা উপজেলার সাকোয়া এলাকার সরেন্দ্রনাথ বর্মণ (৬৩)-এর।
স্বজন হারানোর বেদনা আজও তাড়া করে
সেই ভয়াল দিনের পর চার বছর কেটে গেলেও স্বজন হারানোর শোক ভুলতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা। অনেক পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখনো চলছে টানাপোড়েনের সংসার। কেউ অন্যের জমিতে দিনমজুরি করছেন, কেউবা অল্প জমি চাষ করে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছেন।
নৌকাডুবিতে স্বামীকে হারিয়েছেন আদুরী রানী। দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে এখন তিনিই সংসারের হাল ধরেছেন। অন্যের জমিতে কাজ করে চলে তার সংসার।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কষ্ট সন্তানদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। পাঁচ বছরের সন্তান যখন বাবাকে খোঁজে, তখন অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন আদুরী। সন্তানকে কীভাবে বোঝাবেন—তার বাবা আর নেই, সেই ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছেন তিনি।
আদুরী রানী বলেন, “কীভাবে সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাচ্ছি, সেটা শুধু আমিই জানি। কেউ আমাদের খোঁজখবর নেয় না। শুরুতে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো কিছু সহযোগিতা করেছিল। তা দিয়ে কিছুদিন চলেছি। কিন্তু সেই টাকা আর কয়দিন চলবে? সংসারে একজন পুরুষ মানুষ না থাকার কষ্ট-যন্ত্রণা আমার চেয়ে আর কে ভালো বোঝে।”
ছয় স্বজন হারিয়েও বাবার মরদেহ পাননি স্বপন
সেদিন একই পরিবারের ছয় সদস্যকে হারিয়েছিলেন বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নের কলেজপাড়া এলাকার দর্জি স্বপন কুমার রায়। বোন, দুলাভাই ও বাবাসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে হারানোর সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে।
নির্মাণাধীন সেতু পরিদর্শনে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী
সম্প্রতি নিজ নির্বাচনী এলাকার আউলিয়ার ঘাটে নির্মাণাধীন সেতুর কাজ পরিদর্শন করেন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ।
পরিদর্শনকালে তিনি সেতুর কাজের ধীরগতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, “এটা আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নয়। যদি কেউ কোনো ধরনের অনিয়ম করার সাহস দেখান, তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা কোনো অনিয়ম বরদাশত করব না। কেউ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে সাবধান হয়ে যান।”
২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আউলিয়ারঘাট-কালিয়াগঞ্জ রুটে ৩৪৫ মিটার এবং মাড়েয়া-বড়শশী রুটে ৫৪৫ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রায় ৭৭ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সেতু দুটির নির্মাণকাজ শেষ করে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কথা রয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতুর অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সংযোগ সড়ক নির্মাণে জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাকি কাজ কিছুটা ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
পঞ্চগড় এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মনোজ কুমার আচার্য্য বলেন, “জমি সংক্রান্ত জটিলতায় আউলিয়ার ঘাট-বদেশ্বরী রুটের সেতুর কাজ কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। তবে বিষয়টি সমাধান করে কাজ চলমান রাখার চেষ্টা করছি। এছাড়া মাড়েয়া-কালিয়াগঞ্জ সেতুর কাজ শেষের দিকে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি দ্রুত কাজ শেষ করে সেতু দুটি যান চলাচলের উপযোগী করার।”
স্বপন কুমার রায় বলেন, “পরিবারের পাঁচ সদস্যকে খুঁজে পেলেও এখনো আমার বাবাকে খুঁজে পাইনি। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন, তার মরদেহ আমরা এখনো পাইনি। যদি মরদেহটা পেতাম, তাহলে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। এখনো বাবাকে খুঁজে তার নাতি-নাতনিরা। আসলে কাউকে কীভাবে বোঝাবো স্বজন হারানোর বেদনা?”
চার বছরেও শেষ হয়নি দুর্ভোগ
আউলিয়ার ঘাটের নৌ-ট্র্যাজেডির পর করতোয়া নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি আরও জোরালো হয়। দুই বছর পর ২০২৪ সালে নদীর ওপর পৃথক স্থানে দুটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়।
বর্তমানে সেতু দুটির নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যাশার তুলনায় কাজের গতি ধীর। ফলে এখনো নৌকায় নদী পারাপার করতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
নদী পারাপার হওয়া ষাটোর্ধ্ব আইনুল ইসলাম বলেন, “অনেকদিন ধরে এই আউলিয়ার ঘাট দিয়ে সনাতনীরা বদেশ্বরী মন্দিরে মহালয়ার অনুষ্ঠানে যেত। আমরাও নৌকায় নদী পারাপার হতাম। দীর্ঘদিনেও কেউ সেতু দেয়নি। তবে ৭২ জন মানুষ মারা যাওয়ার পর সরকারের টনক নড়ে। ঘটনার দুই বছর পর সেতুর কাজ শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ হলে আমাদের ভোগান্তি কমবে।”
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন