ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। বাড়ির পাশের খেতে সারি সারি মাচায় লতিয়ে উঠেছে শিমগাছ। গাছে গাছে ঝুলছে খিরা, শসা আর লাউ। যতদূর চোখ যায়, সবুজের সমারোহ। এই সবুজের মাঝেই নিজের স্বপ্ন বুনছেন রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের নারী কৃষি উদ্যোক্তা সেলিনা আক্তার। এক একর ভিটেজমিতে নানা জাতের সবজি চাষ করে তিনি এখন স্বাবলম্বী। তার খেত থেকে প্রতি মাসে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার সবজি।
কান্দি ইউনিয়নের কাবিলাপাড়া গ্রামের সেলিনা আক্তারের কাছে কৃষি শুধু জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক দৃঢ় প্রত্যয়। বাড়ির পাশের জমিতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করছেন তিনি। ঘরের কাজ সামলানোর পাশাপাশি নিয়মিত সময় দিচ্ছেন খেতের পরিচর্যায়। জমি বাড়ির কাছে হওয়ায় সহজেই গাছের যত্ন নেওয়া, সেচ দেওয়া ও ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
সেলিনার খেতে গেলে চোখে পড়ে নানা জাতের সবজির সমাহার। শিমের মাচার পাশাপাশি রয়েছে খিরা, শসা ও লাউ। মৌসুম ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এসব সবজি উৎপাদন করছেন তিনি। উৎপাদিত সবজির একটি অংশ বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে। বাকি সবজি সরবরাহ করছেন আড়তে। এতে নিয়মিত আয়ের পাশাপাশি নিজের উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সেলিনা আক্তার বলেন, নিজের জমিতে নানা ধরনের সবজি চাষ করেছি। আগে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাই, বাকি সবজি আড়তে বিক্রি করি। এতে নিয়মিত আয় হচ্ছে।
শুধু নিজের স্বাবলম্বিতাই নয়, অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছেন সেলিনা। তার খেতে প্রতিদিন গড়ে চার থেকে ছয়জন নারী-পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন। জমি প্রস্তুত, পরিচর্যা, সবজি সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের কাজে তাদের শ্রমের প্রয়োজন হয়। ফলে তার কৃষি উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েকটি পরিবারের জীবিকার প্রশ্নও।
তবে এই পথচলা পুরোপুরি সহজ ছিল না। কৃষি বিভাগ থেকে প্রত্যাশিত পরামর্শ ও সহযোগিতা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও পিছিয়ে যাননি তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা, পরিশ্রম ও পরিকল্পনাকে পুঁজি করে এগিয়ে চলেছেন। ফসলের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বাজারে সবজি বিক্রির হিসাব সবকিছুতেই রয়েছে তার নিজস্ব উদ্যোগ।
চলতি বছর উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছেন সেলিনা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে, উৎপাদন ভালো হলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া গেলে তাঁর এই প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে। তবে কৃষিতে আয় নির্ভর করে উৎপাদন, রোগবালাই, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও বাজারদরের মতো নানা বিষয়ের ওপর।
গ্রামীণ সমাজে নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক নারী পরিবারের কাজ সামলালেও নিজেদের উদ্যোগে আয় করার সুযোগ পান না। সেই বাস্তবতায় সেলিনা আক্তারের পথচলা সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিচ্ছে। নিজের জমিকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেমন আয়ের পথ তৈরি করেছেন, তেমনি স্থানীয় বাজারে সবজির জোগান বাড়াতেও ভূমিকা রাখছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, মাঠপর্যায়ে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বছর সবজি আবাদে উল্লেখযোগ্য রোগবালাই দেখা যায়নি।
কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরামর্শ, উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়তে পারে।
সেলিনা আক্তারের সবুজ খেত তাই কেবল সবজি উৎপাদনের গল্প নয়; এটি পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার গল্প। এক একর জমিকে ঘিরে তার স্বপ্ন এখন আয়ের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানেরও উৎস। যথাযথ সহযোগিতা ও বাজারসুবিধা পেলে তার মতো নারী কৃষি উদ্যোক্তারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন এমন প্রত্যাশাই করছেন স্থানীয়রা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন