চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা, বিদেশি কোম্পানিকে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া, বন্দরের সক্ষমতা, জাতীয় স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তার কারণে শুধু চট্টগ্রাম বন্দরই রক্ষা পায়নি, বাংলাদেশও একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাদের ঐক্য ও দৃঢ়তা দেশের জন্য এখন বড় ভরসার জায়গা।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার তৎপরতা নতুন নয়। প্রায় ৩০ বছর আগে, ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এসএসএ নামের একটি কোম্পানিকে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সেই সময় প্রায় ২০০ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর লিজ দেওয়ার একটি প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আনু মুহাম্মদ বলেন, ওই প্রকল্পের পক্ষে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তৎপর ছিল।
সরকারের ছয় সদস্যের সচিব কমিটিও প্রকল্পটির পক্ষে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসএসএ নামের কোম্পানিটির বাংলাদেশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও কাঠামো নিয়ে গুরুত্ব প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরে ২০০১ সালে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরও চট্টগ্রাম বন্দর লিজ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। সেই সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সরকারের জন্য ‘হানিমুন পিরিয়ড’ এর করণীয় তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দর এসএসএ কোম্পানিকে দেওয়ার বিষয়টি রাখা হয়েছিল।
বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সেই সময় তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে আন্দোলন, চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিরোধ এবং আইনি প্রক্রিয়া একসঙ্গে চলেছিল। আদালতের প্রক্রিয়ায় প্রকল্পটির বিভিন্ন অসংগতি সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে সেই প্রকল্প আর বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেও আমরা বাস্তব কর্মকান্ডে পরিবর্তন দেখতে পাই না। একই ধরনের বিষয় বারবার ফিরে আসছে। কিছু গোষ্ঠী একইভাবে কাজ করছে এবং একই ধরনের অস্বচ্ছতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখা হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার যে উদ্যোগ চলছে, তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন থাকলে সরকারকে যুক্তি ও তথ্য দিয়ে জনগণের সামনে তা উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন প্রশ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেওয়া হচ্ছে না এবং চুক্তিগুলোও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লাভজনক প্রতিষ্ঠান। সেখানে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটির হাতে উদ্বৃত্ত অর্থও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বন্দরের মাসুল বাড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, যেখানে বিদ্যমান লাভ হচ্ছে, সেখানে কী কারণে মাসুল বাড়ানো হবে? মাসুল বাড়ানো মানে আমদানি-রফতানি ব্যয় বাড়বে। এতে দেশের অর্থনীতির উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে।
বিদেশি কোম্পানি এলে দেশের সক্ষমতা বাড়বে— এমন যুক্তিরও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করা হলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সিঙ্গাপুরের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তুলে নিজেদের বন্দর পরিচালনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদেশি কোম্পানির হাতে বন্দর তুলে দিয়ে সিঙ্গাপুর তার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছায়নি।
ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশও নিজেদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে বন্দর পরিচালনা করছে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিদেশি কোম্পানির বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব¡ তুলে ধরে আনু মুহাম্মদ বলেন, বাংলাদেশের মোট আমদানি-রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। ফলে দেশের অর্থনীতির ‘হৃদপিণ্ড’ হিসেবে বিবেচিত এই বন্দর অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্য কোনো সাধারণ বন্দরের সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হলে কাস্টমস ব্যবস্থার সংস্কার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানি নিয়ে আসার সঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশি কোম্পানি আনার বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর রাজনৈতিক ও সামরিক মাত্রাও রয়েছে। সেটিও আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট বিভিন্ন চুক্তি ও সিদ্ধান্তের জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো চুক্তি করা হলে দীর্ঘ সময় পর হলেও তার জন্য সংশি¬ষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ বলেন, কোনো সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে যায় কিংবা জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে।
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনাল তুলে দেওয়ার আগে দেশের প্রকৃত সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে যে জট দেখা যাচ্ছে, তার বড় কারণ কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা। কনটেইনার সময়মতো খালাস না হওয়ায় ট্রাক ও কনটেইনার পড়ে থাকছে এবং নতুন জাহাজ এসে অপেক্ষা করছে। ফলে বন্দরের ওয়েটিং টাইমও বাড়ছে।
মোশাহিদা সুলতানা বলেন, বন্দরের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো— বিশেষ করে রেল যোগাযোগ ও অন্যান্য সংযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে গড়ে ওঠার আগেই বিভিন্ন টার্মিনাল পরিচালনার বিষয়ে চুক্তি করা হচ্ছে। এতে ভবিষ্যতে প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতার অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে।
এলএনজি টার্মিনাল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, জ্বালানি ব্যবস্থায় অতিরিক্ত এলএনজি-নির্ভরতা বাড়লে দেশের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে রফতানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে আমদানি-রফতানির চাহিদাই একসময় কমে যেতে পারে।
এপিএম টার্মিনাল প্রসঙ্গে মোশাহিদা সুলতানা বলেন, যেভাবে বিনিয়োগ আসার কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে ২০৩০ সালের মধ্যে সেই বিনিয়োগ নাও আসতে পারে। বিদেশি অপারেটররা অবকাঠামোর মৌলিক উন্নয়নের পরিবর্তে কিছু যন্ত্রপাতি, গ্যান্ট্রি ও অটোমেশন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু তাতে বন্দরের মূল জটিলতা দূর হবে না।
তিনি আরও বলেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের নিজেদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। সেই পরিকল্পনার ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে বিনিয়োগ করতে হবে এবং কোন বন্দর কতটা প্রয়োজন, তারও পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করা দরকার।
লালদিয়া টার্মিনাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতার কথা বলা হলেও ড্রেজিং ও সিলটেশনের বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণের আগে পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্বাসযোগ্য সমীক্ষা প্রয়োজন।
মোশাহিদা সুলতানা বলেন, বিভিন্ন সময় এসব প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও সরকার যথাযথ তথ্য দিয়ে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বিশেষ করে চুক্তির শর্ত, বিনিয়োগ না হলে কী হবে, বিনিয়োগের পর অবকাঠামো কীভাবে রাষ্ট্রের কাছে ফিরবে এবং বিদেশি কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশের করণীয় কী- এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর থাকা দরকার।
তিনি আরও বলেন, নতুন চুক্তি করার আগে পুরো বন্দর ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। ২০৩৫ সাল নাগাদ বন্দরের সম্ভাব্য সক্ষমতা কতটুকু প্রয়োজন হবে, সেই হিসাবও নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন থাকলেও জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিদেশি অপারেটরের হাতে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল দেওয়ার আগে চুক্তির সব শর্ত, সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জনগণের সামনে প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন