বাঁশ দিয়ে নৌকা বানিয়ে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তিস্তা নদীপথ পাড়ি দিয়ে ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে ঐতিহ্যবাহী ‘একক নজরানা’। স্থানীয়ভাবে এটিকে বাঁশের ভূরা বলা হয়।
বিশ্ব ইসলামী মহাসম্মেলন-২০২৭ ও পবিত্র ওরস শরীফ উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) উষালগ্নে ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট তিস্তা নদীর পাড় থেকে বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত এই নৌকাটি ফরিদপুরের দরবার শরীফের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
দীর্ঘ দুই মাসের প্রস্তুতি ও কঠোর পরিশ্রমে তৈরি এই বাঁশের ভুঁড়াটির যাত্রাকে কেন্দ্র করে তিস্তাপারে সৃষ্টি হয় এক উৎসবমুখর ধর্মীয় আবহ।
আয়োজকরা জানান, গত ৮ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাঁশের ভুঁড়া তৈরির কাজের উদ্বোধন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাজারহাট উপজেলার কর্মী গ্রুপ, জাকের ও আশেকানদের যৌথ উদ্যোগে তিস্তাপারে নিরলসভাবে ভুঁড়া নির্মাণের কাজ চলে। টানা দুই মাসের পরিশ্রম ও প্রস্তুতি শেষে গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ভুঁড়াটির নির্মাণকাজ চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন হয়।
নির্মাণকাজ শেষে সোমবার সন্ধ্যায় বুড়িরহাট তিস্তাপারে এক বিদায়ী মাহফিলের আয়োজন করা হয়। জিকির, ওয়াজ ও ধর্মীয় আলোচনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত ভক্ত-আশেকান এই মাহফিলে অংশ নেন। রাতভর দরবার শরীফের নিয়ম অনুযায়ী ইবাদত-বন্দেগি শেষে পরদিন ভোরে ফরিদপুরের উদ্দেশে যাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
মঙ্গলবার ভোরে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ নদীপথের যাত্রা। রঙ-বেসংয়ের পতাকা ও রঙিন কাগজে সুসজ্জিত বাঁশের ভুঁড়াটি নদীর স্রোত ভেঙে ফরিদপুরের দিকে এগিয়ে চলে। এই চোখঝলসানো দৃশ্য দেখতে ও বিদায় জানাতে ভোর থেকেই বুড়িরহাট তিস্তাপারে ভিড় জমান স্থানীয় নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোররা। উপস্থিত অনেককে মুঠোফোনে স্মরণীয় এই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়।
স্থানীয় আশেকানদের মতে, নদীপথে রোদ, বৃষ্টি ও তীব্র স্রোতের মতো প্রতিকূলতা থাকলেও তা ভক্তদের আবেগে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। তিস্তা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুস ছালাম জানান, “আশেকানরা বিশ্বাস করেন এই নজরানা ও দরবারে যাতায়াতের মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি মেলে। এটি তাদের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় আচার ও বিশ্বাসের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।”
বিশ্ব জাকের মঞ্জিল কর্মী গ্রুপ রাজারহাট থানা কমিটির সেক্রেটারি রেজাউল করিম রতন বলেন, “প্রতিবছরই বিশ্ব ইসলামী মহাসম্মেলন ও পবিত্র ওরশ শরীফ উপলক্ষে রাজারহাট থেকে ‘একক নজরানা’ হিসেবে এই বাঁশের ভুঁড়া পাঠানো হয়। দীর্ঘদিনের একাগ্রতা ও হাজারো ভক্তের শ্রমে নির্মিত এই ভুঁড়াটি এবারও অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ফরিদপুরের দরবার শরীফে পাঠানো হয়েছে।”
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে এখন তিস্তার বহমান ঢেউ পেরিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে ফরিদপুরের বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে নিরাপদে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে এই আধ্যাত্মিক নজরানা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন