সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব, শ্যামা পূজা (কালী পূজা) ও আলোর উৎসব দীপাবলিকে কেন্দ্র করে জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার কুমারপল্লীতে মাটির প্রদীপ (দিয়ারি) তৈরিতে এখন চরম ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। উৎসবের বাড়তি চাহিদা মেটাতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা। পরিবারের নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে শিশু-কিশোররাও এই কাজে সাধ্যমতো সহযোগিতা করছে।
কালী পূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে প্রতিবছরই মাটির তৈরি প্রদীপের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রদীপের আলোয় ঘরবাড়ি ও পূজামণ্ডপ সাজানো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। আর এই চাহিদাকে ঘিরেই ফুলবাড়ীর কুমার পল্লীগুলোতে এখন উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা বিরাজ করছে।
ফুলবাড়ী সদর ইউনিয়নের চন্দ্রখানা কুমারপাড়ায় সরেজমিনে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীরা অত্যন্ত নিপুণ হাতে প্রদীপ তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ চাকা ঘুরিয়ে প্রদীপ গড়ছেন, আবার কেউ সেগুলো রোদে শুকানো ও সাজানোর কাজে ব্যস্ত। পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সেখানে তৈরি হচ্ছে হাজার হাজার মাটির প্রদীপ।
স্থানীয় কারিগররা জানান, এসব প্রদীপের চাহিদা শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুলবাড়ী ও আশপাশের বিভিন্ন হাটবাজারের পাশাপাশি পাশের লালমনিরহাটের বড় বাড়ি, নয়ারহাট এবং নাগেশ্বরীর গাগলা বাজারের ক্রেতা ও বিক্রেতারাও এখান থেকে প্রদীপ সংগ্রহ করে থাকেন।
মৃৎশিল্পী বিষ্ণু চন্দ্র পাল ও তার স্ত্রী টুম্পা রানী পাল জানান, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কালী পূজা ও দীপাবলির আগে মাটির প্রদীপের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ বছর তারা প্রায় ২০ হাজার মাটির প্রদীপ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। যার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে বাড়িতে বসেই প্রতি ১০০টি প্রদীপ ৫০ টাকা দরে ১০ হাজার প্রদীপ বিক্রি করেছেন। বাকি প্রদীপগুলো উপজেলার বালার হাট, গংগা হাট, খড়িবাড়ি ও নেওয়াশীসহ বিভিন্ন বাজারে প্রতি ১০০টি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রির আশা করছেন তারা।
তারা আরও জানান, ১৩ দিনের কঠোর পরিশ্রম ও ২০ হাজার প্রদীপ তৈরিতে মাটি, জ্বালানি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব প্রদীপ বিক্রি করে ৬ হাজার টাকা আয়ের প্রত্যাশা করছে এই পরিবার।
একই পল্লীর তাপস কুমার পাল, আনন্দ কুমার পাল ও বেরেন চন্দ্র পাল জানান, কেউ ১৫ হাজার, কেউ ১০ হাজার আবার কেউ ৫ হাজার প্রদীপ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে টানা ১২ থেকে ১৫ দিন ধরে কাজ করছেন। তবে বর্তমান বাজারে মাটির দাম, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের খরচ অনেক বাড়লেও সে তুলনায় প্রদীপের দাম বাড়েনি। ১৫ থেকে ২০ বছর আগে এই পেশায় যে আয় হতো, বর্তমানে তার ধারেকাছেও নেই। বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও পেশা বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েই তারা এই পেশায় টিকে আছেন। উৎসবের ব্যস্ততা শেষে তারা আবারও হাঁড়ি-পাতিলসহ মাটির অন্যান্য সামগ্রী তৈরির কাজে ফিরবেন।
চন্দ্রখানা কুমারপাড়ার স্থানীয় কারিগরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় প্রায় ১০০টি পরিবার বংশ পরম্পরায় মাটির তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী তৈরির সাথে যুক্ত। এসব পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন এই মৃৎশিল্প। তবে দিন দিন আয় কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারই বর্তমানে আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি কার্তিক চন্দ্র সরকার ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি সুনীল চন্দ্র রায় বাসসকে বলেন, আগামী ৮ নভেম্বর (রোববার) অমাবস্যা তিথিতে মহাশক্তিরূপিণী, দুর্গতিনাশিনী শ্রীশ্রী শ্যামা মায়ের পূজা-অর্চনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবছরের মতো এবারও শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উপলক্ষে কুমার পল্লীগুলোতে মাটির প্রদীপের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা মণ্ডপের পাশাপাশি নিজেদের ঘরবাড়ি ঐতিহ্যবাহী মাটির প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত করবেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন