হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশ-ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিলি স্থলবন্দর। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচির কারণে গত ৩০ আগস্ট থেকে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। প্রথমে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার কারণ দেখানো হলেও পরে সামনে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন ট্রাক ওজননীতি। পাশাপাশি ট্রাক ওভারলোডিং নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বিরোধের গুঞ্জনও রয়েছে। ফলে হিলি বন্দরে বাণিজ্য বন্ধের নেপথ্যে আসল কারণ কী—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
তবে চলমান সংকট নিরসনে বৃহস্পতিবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের রাজশাহীস্থ সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার বৃহস্পতিবার দুপুরে হিলি স্থলবন্দর পরিদর্শনে আসবেন। এ সময় তিনি হিলিতে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানি-রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন বলে জানিয়েছেন হিলি কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের হিলি অংশে আন্দোলনরত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে দেশটির প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলের নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। চলমান অচলাবস্থা নিরসনে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
যেভাবে শুরু
গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় ভারতীয় রপ্তানিকারক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিকাশ চন্দ্র মণ্ডলের স্বাক্ষর করা একটি চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ অংশের বাংলাহিলি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনকে বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থলবন্দরের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে পড়ছে হিলি। এ অবস্থায় হিলি স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে সমস্যার প্রতিবাদে ৩০ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চিঠি পাওয়ার পর থেকেই হিলি বন্দরের বাংলাদেশ অংশে পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ ও পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে উভয় দেশের ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন শ্রমিকসহ বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ সমস্যায় পড়েন।
প্রকৃত কারণ নিয়ে শুরু হয় ধোঁয়াশা
বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াকে আনুষ্ঠানিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে আরও কয়েকটি কারণের কথা সামনে আসে।
দক্ষিণ দিনাজপুরের স্থানীয় সূত্র ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাকে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন বা ওভারলোডিং নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিরোধের জেরেও বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকতে পারে।
তবে ভারতীয় রপ্তানিকারক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিকাশ মণ্ডল এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা পুলিশের বিরুদ্ধে তাদের নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। সংগঠনের কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং ব্যবসায় লোকসানের বিষয়টি তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ফলে শুরুতে তিন ধরনের ব্যাখ্যা সামনে আসে—বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া, পুলিশের সঙ্গে বিরোধ এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামনে আসে আরও নির্দিষ্ট একটি কারণ।
নেপথ্যে নতুন ওজননীতি?
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ট্রাকে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন করে ওজনসীমা নির্ধারণ করেছে। নতুন নিয়ম ৩০ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় ছয় চাকার ট্রাকে সর্বোচ্চ ২০ টন এবং ১০ চাকার ট্রাকে সর্বোচ্চ ৩০ টন পণ্য পরিবহনের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে তাদের দাবি, আগে ছয় চাকার ট্রাকে প্রায় ৩০ টন এবং ১০ চাকার ট্রাকে ৪০ থেকে ৪৫ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করা হতো।
অর্থাৎ নতুন নিয়ম কার্যকর হলে ট্রাকপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টন পর্যন্ত পণ্য বহনের সক্ষমতা কমে যায়। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, একই পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে পাঠাতে এখন আগের তুলনায় বেশি ট্রাকের প্রয়োজন হবে। এতে পরিবহন খরচ, শ্রমিক ব্যয় এবং সার্বিক ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাবে।
এ কারণেই নতুন ওজননীতি প্রত্যাহার বা পুনর্বিবেচনার দাবিতে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা আন্দোলনে নেমেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
একক সংগঠনের নয়, যৌথ কর্মসূচি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হিলি স্থলবন্দরের ভারতীয় অংশের একটি মাত্র ব্যবসায়ী সংগঠন নয়, একাধিক ব্যবসায়ী সংগঠন যৌথভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তাদের অন্যতম দাবি—পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থলবন্দরের সঙ্গে হিলি বন্দরের ব্যবসায়ীদেরও সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, নতুন ওজনসীমার কারণে হিলি বন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে পড়লে এই বন্দর পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় আরও পিছিয়ে পড়বে। তাই শুধু ওজননীতি নয়, হিলি বন্দরের সামগ্রিক বাণিজ্যিক সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
যখন বাণিজ্য বাড়ানোর আলোচনা, তখনই অচলাবস্থা
হিলি বন্দরের বর্তমান অচলাবস্থা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে।
গত এক বছর ধরে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্য কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যেই ২৪ আগস্ট দুই দেশের বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বৈঠকে বন্ধ সীমান্ত হাট ও স্থলবন্দরগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় সচল করার বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।
অর্থাৎ একদিকে দুই দেশের পর্যায়ে সীমান্ত বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ, অন্যদিকে কয়েক দিনের ব্যবধানে হিলি স্থলবন্দরে অনির্দিষ্টকালের অচলাবস্থা—দুই ঘটনাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন পরিবহন বা ওজননীতি নিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয়েছে, সেটিকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই প্রয়োজন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন